বাঙ্গি জাতীয় সুস্বাদু ফল লালমি দেখতে অনেকটা বাঙ্গির মতো হলেও স্বাদ ও ঘ্রাণে এটি ভিন্ন। পানির পরিমাণ বেশি থাকায় রোজাদারদের কাছে ফলটি বেশ জনপ্রিয়। রমজান সামনে রেখে প্রতি বছর ফরিদপুরের কৃষকরা লালমির চাষ করেন। এবারও সদরপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এর আবাদ হয়েছে। কম খরচে লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে লালমির চাষ। চলতি মৌসুমে একশ লালমি প্রকারভেদে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লালমি উত্তোলনে ব্যস্ত কৃষকরা
সরেজমিনে সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা লালমি উত্তোলনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ক্ষেত থেকে লালমি তুলে পাশেই ধোয়া হচ্ছে, এরপর ভ্যান ও গাড়িতে করে পাঠানো হচ্ছে হাটে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এতে শ্রম দিচ্ছেন।
লালমি চাষি আবেদ আলী বলেন, ‘এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে, পাশাপাশি দামও ভালো পাচ্ছি। যদিও খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে, তবে লাভ ভালোই হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: আলুর দাম কম হওয়ায় চাষিরা ছুটছেন হিমাগারে, পড়ছেন সিন্ডিকেটের খপ্পরে
অন্য এক চাষি ছলেমান শেখ বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে প্রতি বছরই আমরা লালমি চাষ করি। চার মাসের মধ্যেই বিক্রি করা যায়, খরচও কম, লাভও বেশি। তাই এলাকার কৃষকেরা লালমির চাষে আগ্রহী হচ্ছে।’

লালমি চাষে নারীদের অংশগ্রহণ
নারীরাও লালমি চাষ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। শারমিন বেগম বলেন, ‘লালমি আবাদ থেকে উত্তোলন পর্যন্ত পরিবারের সবাই মিলে কাজ করি। এখান থেকে যা লাভ হয়, তা দিয়ে সারা বছরের সংসার ও সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চলে।’
কৃষিকাজ করে সংসার চালানো শিউলি আক্তার বলেন, ‘বাবা অসুস্থ, সংসারের দায়িত্ব আমার ওপর। তাই গত পাঁচ বছর ধরে লালমি চাষ করছি। কম সময় ও খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এটা চাষ করি।’
গৃহবধূ লাকি খাতুন বলেন, ‘লালমির মৌসুমে ক্ষেতে কাজ করি। কখনো লালমি তুলি, কখনো ধুই। প্রতিদিন দুই থেকে তিনশ টাকা রোজগার হয়, যা সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনায় কাজে লাগে।’

লালমির বাজার ও বাণিজ্য
উপজেলার চর দড়িকৃষ্ণপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে লালমির হাট। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা লালমি কিনে নিয়ে যান। এখানে কোনো আড়ৎদারি নেই। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যাপারীরা এসে লালমি কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন। ফরমালিন মুক্ত হওয়ায় এখানকার লালমির চাহিদা দেশজুড়ে।
পাবনা থেকে আসা পাইকার কবির হোসেন বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে দুই দিন এখানে আসি। একশ লালমি আড়াই হাজার থেকে আট হাজার টাকায় কিনতে হয়। গাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একশ পিসে এক হাজার টাকা খরচ হয়। পরে প্রতিটি লালমি ১০ টাকা লাভে বিক্রি করি।’
আরও পড়ুন: ধান ছেড়ে তামাক চাষ, পরিবেশ বিপর্যয়ের দায় নেবে কে?
ঢাকা থেকে আসা ব্যাপারী সামচুল আলম বলেন, ‘এখানে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে লালমি কেনা যায়, কোনো আড়ৎদার নেই। এখানকার লালমির স্বাদ ভালো, রাসায়নিক মুক্ত হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা রয়েছে।’
ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, ‘এই হাটে প্রতিদিন চার লাখ টাকার লালমি বিক্রি হচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, বিক্রিও বাড়ছে।’

লক্ষ্যমাত্রা ও কৃষি বিভাগের তথ্য
ফরিদপুর কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লালমি আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, ‘রমজান সামনে রেখে এ অঞ্চলের মানুষ লালমির চাষ করে। কম খরচে লাভজনক হওয়ায় চাষ বাড়ছে। এ বছর বাম্পার ফলনের পাশাপাশি ভালো দামও পাচ্ছেন কৃষকেরা। চাহিদা থাকায় জেলার লালমি দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার লালমিতে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না, তাই এটি সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। এ কারণেই দেশজুড়ে ফরিদপুরের লালমির চাহিদা বেড়েছে।’