বুধবার (১৯ মার্চ) হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
চীন সফরকালে ড. ইউনূস আগামী ২৭ মার্চ হাইনান প্রদেশে বোয়াও ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেবেন। পরদিন অর্থাৎ ২৮ মার্চ চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি। এরপর ড. ইউনূস পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেবেন। সেখানে তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হবে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন মতে, ড. ইউনূস এমন সময় চীন সফরে যাচ্ছেন, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর নয়াদিল্লি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকে আশ্রয় দেয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি হচ্ছে।
এরপর ভারত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার অভিন্ন সীমান্তে বেড়া নির্মাণ শুরু করলে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে তাদের ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে। তারা বলে যে এর ফলে ‘সীমান্তে উত্তেজনা ও অস্থিরতা’ সৃষ্টি হয়েছে। পরদিন ভারতও একই পদক্ষেপ নেয় এবং দাবি করে যে বেড়া নির্মাণে ‘সমস্ত প্রোটোকল ও চুক্তি’ অনুসরণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন মতে, ঢাকা-নয়াদিল্লি উত্তেজনার সর্বশেষ উৎস হলো মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডের মন্তব্য, যিনি বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের অধীনে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে ভারতের দাবির প্রতিধ্বনি করেছেন। ড. ইউনূসের কার্যালয় তার মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধানের মন্তব্য ‘কোনো প্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়নি।’
এমন পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের চীন সফর তার অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক বৈধতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদন মতে, বেইজিংয়ের সমর্থন ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে যখন তিনি প্রধান শক্তিগুলোর কাছ থেকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি চাইছেন।
সংবাদমাধ্যমটি আরও বলেছে, ড. ইউনূস ও চীনা কর্মকর্তাদের মধ্যে যে বৈঠক হবে সেটির অন্যতম বড় এজেন্ডা থাকবে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। চীন ২০০৬ সালে ভারতকে টপকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়। এর মধ্যে গত বছর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
আরও প৪ড়ুন: পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার
এছাড়া ২০১৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভে যোগ দেয়। এরপর থেকে চীনের কাছ থেকে অনেক বড় প্রোজেক্টে বিনিয়োগ পেয়েছে ঢাকা।
এছাড়া চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে একাধিক রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ প্রোজেক্টে কাজ করেছে। বিশেষ করে পদ্মাসেতু রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেলের কাজ করেছে তারা। মোংলা বন্দর সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ এখন চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ চাইছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেয়ার ব্যাংক সেন্টারের চীনা স্টাডিজের অনাবাসিক সহযোগী আনু আনোয়ার বলেছেন, ‘ড. ইউনূস চীনকে আশ্বস্ত করবেন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত আছে।’
আনু আনোয়ারের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে যেহেতু ড. ইউনূস ইতোমধ্যে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছেন। তাই চীনকে তার আশ্বস্ত করতে হবে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও তারা তার সরকারকে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে ভাবতে পারে। তবে চীন হয়তো সতর্কতার সঙ্গে এগোতে পারে। তারা ড. ইউনূসকে কিছু ক্ষেত্রে আশ্বাস দিলেও সামনের নির্বাচিত সরকারের জন্য বেশিরভাগই রেখে দিতে পারে।
চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া স্টাডিজ সেন্টারের উপ-পরিচালক লিন মিনওয়াং বলেছেন, পতনের এক মাস আগে শেখ হাসিনা চীনে গিয়েছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ২০টি সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যার মধ্যে চীন বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ইউয়ান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ড. ইউনূস তার সফরে শেখ হাসিনার করে আসা এসব চুক্তির কিছু এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন লিন মিনওয়াং।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে: মার্কিন সিনেটর
তিনি বলেন, ‘হাসিনার পতনের পর অনেক সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড থমকে ছিল। আমি মনে করি এগুলো এখন শুরু করার সময় এসেছে।’ শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে দেয় বেইজিং। তাকে ভারতপন্থি হিসেবে দেখা হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন, ড. ইউনূসের চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি যৌথ নদী রয়েছে। যেগুলোর বেশিরভাগের উৎপত্তি ভারতে। আর এ বিষয়টি কাজে লাগিয়ে সীমান্ত আলোচনায় সুবিধা আদায় করে নিয়েছে নয়াদিল্লি। কিন্তু ২০১৬ সালে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুত্থান প্রজেক্টের ঋণের জন্য চীনের দারস্থ হয় বাংলাদেশ। যা পরবর্তীতে দিল্লিতে সতর্কতার সৃষ্টি করে।
এরপর থেকে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। যদিও এই প্রকল্পে ভারতকে সহায়তা করতে একাধিকবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে চীন। কিন্তু ভারত জানিয়েছে, এই প্রকল্পের কাজ তারাই করবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের মধ্যে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে এই প্রকল্পটি সেটির একটি বড় উদাহরণ। এ নিয়ে দুই দেশই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আরও পড়ুন: আমরা বলছি ডিসেম্বরে নির্বাচন, এর মধ্যেই সংস্কার করতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেছেন, ‘তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হলে এটি শুধুমাত্র টেকনিক্যাল অথবা আর্থিক বিষয় হবে না। এটি হবে একটি রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘তিস্তা প্রকল্প ছিল বাংলাদেশ-ভারত-চীনের ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি অন্যতম বিষয়। যা নিয়ে বড় মতানৈক্য ছিল। এবার যদি এ বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক কিছু হয়; তাহলে সেটি এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা প্রমাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন হবে।’
]]>