উপকূলজুড়ে বিরাজ করছে বৈরী আবহাওয়া। আগুনমুখা নদীর উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে ভাঙা তীরে। গোধূলিলগ্নে আকাশে জমে থাকা কালো মেঘ বৃষ্টির বার্তা দিচ্ছে। ঠিক সেই সময় ছোট একটি নৌকা বেয়ে তীরের দিকে আসছেন এক নারী। প্রবল বাতাস আর ঢেউয়ের তাণ্ডব যেন হাতে থাকা বৈঠাটি কেড়ে নিতে চাইছে। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। শক্ত মুঠোয় বৈঠা চালিয়ে পৌঁছে যান ঘাটে।
কাছে গিয়ে জানা গেল ওই নারীর নাম শাবানা আক্তার (৩০)। পরিবারের সদস্য বলতে ১৫ বছর বয়সী এক ছেলে। তাকে সঙ্গে নিয়েই আগুনমুখা নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই আগুনমুখার বুকে সংগ্রাম করে চলছে শাবানার জীবন।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে আগুনমুখা নদীর তীরে অবস্থিত বোয়ালিয়া স্পিডবোট ঘাট। এই ঘাটে নৌকায় শাবানার মতো দুই শতাধিক পরিবার স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। যাদের মূল পেশা ছোট ছোট নৌকার মাধ্যমে নদীতে মাছ ধরা। এসব মানুষের মধ্যে ৮০ শতাংশই শিশু ও নারী।
সরেজমিনে কথা বলে জানা গেল, প্রায় ২০ বছর ধরে নদীর তীরে বসবাস করা এই মানুষেরা রান্নাবান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজ নৌকাতেই করেন। জেলার অন্যান্য এলাকা বা উপজেলার জেলেরা সরকারি সহায়তা পেলেও তালিকায় নাম না থাকায় তারা এখনো বঞ্চিত।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ ও সুযোগ–সুবিধা পেতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হয়। এ ছাড়া বাড়ির হোল্ডিং নম্বর, ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্রের মতো নথিপত্র এখানকার মানুষের নেই। তবে বিশেষ বিবেচনায় এসব অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব জেলে ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সরকারি সুবিধার আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি। সামনে হয়তো তারা সরকারি সুবিধা পাবে।’
নদীতে জীবিকা, নদীতেই বসবাস
পটুয়াখালী-গলাচিপা উপজেলার সঙ্গে রাঙ্গাবালী উপজেলা এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম এই প্রমত্তা আগুনমুখা নদী। বঙ্গোপসাগরের মোহনা হওয়ায় বছরজুড়েই নদীটি উত্তাল থাকে। নদীর তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা চরেই ছিন্নমূল মানুষের জীবনসংগ্রাম। পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীকে ঘিরে নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে ছোট্ট পরিসরের হাট–বাজারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকানপাট। তবে সেখানে থাকা বা বসবাসের জন্য কোনো কাঁচা-পাকা ঘর নেই। আগুনমুখার তাণ্ডবসহ নানা প্রতিকূল পরিবেশ উপেক্ষা করে এসব পরিবার নৌকাতেই বসবাস করে।
গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে কথা হয় বোয়ালিয়া ঘাটের মাছের আড়তদার খলিল মুন্সির (৭০) সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বোয়ালিয়া ঘাটের ১০০ থেকে ১৫০টি পরিবার নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এসব পরিবারের সদস্যদের মাছ ধরা শুরু হয় শিশু বয়স থেকেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই নদীতে মাছ ধরেন। তিনি আরও বলেন, মাছ ধরার এসব মানুষ পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল ও বাউফল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। কোনো কোনো পরিবার এখানকার ভোটারও হয়েছেন।
আট বছর আগে ঋণগ্রস্ত হয়ে নিজ গ্রাম ছেড়ে এসে বোয়ালিয়া ঘাটের বাসিন্দা হয়েছেন আলেয়া বেগম (৩২। তাঁর বাড়ি ছিল বাউফল উপজেলার নুরাইপুর ইউনিয়নে। এখানে এসে অন্য নারীদের সঙ্গে মাছ ধরার পেশা বেছে নিয়েছেন।
আলেয়া বেগম বলেন, সোমবার তিনি ৭০০ টাকার ডিজেল কিনে নদীতে মাছ ধরতে যান। সারা দিন ঘুরে ৩০০ টাকার মাছ পেয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ছয়– সাত বছর ধরে নদীতে মাছ ধরি, বাজারে বেচি। থাকার জন্য একটি ঘর তুলতে পারিনি। পুরুষ জেলেদের সরকারি তালিকায় নাম আছে, অথচ আমার নামটি আজও তালিকায় ওঠেনি। এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি কোনো সাহায্য এলেও আমাকে দেওয়া হয় না। বলা হয়, তালিকায় নাম না থাকায় দেওয়া যাচ্ছে না।’
নদীতেই বেড়ে উঠছে শিশুরা
আগুনমুখার তীর ধরে সামনে এগিয়ে দেখা যায়, নদীর ভাঙনমুখী তীরে বসে আছেন রেহেনা বেগম (২৪)। কোলে ছয় বছর বয়সী শিশু সোহাগ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদীতে ঢেউ বেড়ে গেলে নৌকা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। এরপর মলিন মুখে নদীর তীরে নৌকার পাশেই বসে আছেন। তাঁর বাড়ি ছিল বাউফল উপজেলার কালাইয়া বন্দরে। অভাবে পড়ে ১০ বছর আগে নিজ এলাকা ছেড়ে এখানে বসবাস শুরু করেন। স্বামী সোহেল ভুঁইয়া (৩২) ও মিথিলা নামের ১০ বছর বয়সী মেয়ে রয়েছে তাঁর। উপকূলের প্রতিকূল পরিবেশ মাথায় নিয়েই দিন-রাত নৌকাতেই বসবাস করতে হয় তাঁদের।
রেহেনা বলেন, ‘নদীতে অনেক বাতাস বইছে, নৌকা নিয়ে টেকা যায় না। তাই নৌকা ঘাটে বেঁধে শিশু সোহাগকে নিয়ে নদীর তীরে বসে আছি। তেলের দাম বেশি, পাওয়া যায় না। ঘরে চাল নেই, খাওয়ার মতো অন্য কোনো খাবারও নেই। নদীতে ঢেউ, এই বন্যা কয়দিন থাকবে, কী খাব’—এসব দুশ্চিন্তার ভাঁজ কপালজুড়ে।
ঘাটে বাঁধা আরেকটি নৌকায় বসে মাছ ধরার জাল গোছাতে দেখা যায় ১০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর হোসেন ও তার মামা সাগরকে (১৩)। জাহাঙ্গীরের বাবা দুলাল সরদার ও মা মিছি বেগম মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। জাহাঙ্গীরও মা-বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরে। এ সময় জাহাঙ্গীর বলে, ‘ছোটবেলা থেকেই মা–বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরি। স্কুলে যাই না। দিন-রাত নদীতে থাকি, স্কুলে কখন যামু? স্কুলে গেলে খাওয়া দেবে কেডা?’
জাহাঙ্গীরের মা মিছি বেগম বলেন, ‘নদীতে থাকি, নদীতে ঘুমাই। শুধু মাছ বেচাসহ কিছু দরকার হলে বাজারে যাই। পোলারে স্কুলে পড়ামু কহন? স্কুলে গেলে আমাগো খাওন দেবে কেডা?’
‘ঘরে ভাত না থাকলে স্কুল দিয়া কী করমু’
আগুনমুখা নদীর তীরে গড়ে ওঠা ছোট্ট সেই পল্লিতে রয়েছে চা–সহ কয়েকটি অন্য দোকান। তীরঘেঁষা একটি চায়ের দোকানে বসে ছিল ১৪ বছর বয়সী রুমান সরদার। বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। এখন নিয়মিত স্থানীয় একটি বরফকলে শ্রমিকের কাজ করে। এতে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। আবার বরফকলে কাজ না থাকলে অন্য জেলের নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরে সে।
রুমান বলে, ‘সংসারে অভাব দেখা দিলে মা–বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরি। আবার মাঝে মাঝে বরফকলে কাজ করি।’ স্কুলে না যাওয়া প্রসঙ্গে বলে, ‘স্কুল গেলে তো খাওন পাওয়া যায় না। ঘরে ভাত না থাকলে স্কুল দিয়া কী করমু? স্কুলে গেলে কি আর বড় কিছু হইতে পারুম? কাজ কইরাই তো খাইতে অইবে, তাই কাজই করি।’
রুমানের পাশে বসা ১৫ বছর বয়সী আরেক শিশু রুবেল হাওলাদার। রুবেল অন্যের নৌকার শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। থাকে ৭০ বছর বয়সী নানা নয়া মিয়ার সঙ্গে। চার বছর আগে রুবেলের মা রানী বেগম ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর বাবা জব্বার হাওলাদার দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার পাতেন। বড় ভাই রানা বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকেন। বড় বোন শিরিন আক্তারের বিয়ে হয়েছে। রুমনের আট বছর বয়সী ছোট বোন ফেরদৌসি থাকে ফুফুর কাছে।
রুবেল জানায়, ‘মা মারা যাওয়ার আগ থেকেই আমি নদীতে মাছ ধরি এবং পরিবারকে টাকা দিতাম। এখনো মাছ ধরে আয় করা টাকা বৃদ্ধ নানাকে দিই। কোনো দিন স্কুলে যাওয়া হয়নি।’
তীরঘেঁষা পল্লিটি ঘুরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিশুর দেখা পাওয়া যায়। যাদের বয়স ৭ বছর থেকে ১৪-১৫ বছরের মধ্যে। এসব শিশুর মধ্যে অনেকেই নদীতে মাছ ধরে। কেউ বাবার সঙ্গে, কেউ মায়ের সঙ্গে। মায়ের আঁচল ধরে থাকার বয়সী এসব শিশুর সারা দিন কেটে যায় আগুনমুখার বুকে। নদীতে আছড়ে পড়া বড় বড় ঢেউ আর রোদ-বৃষ্টি তাদের নিত্যসঙ্গী। সারা দিন নদীতে ঘুরে সন্ধ্যার আগে আগে ঘাটে আসে তারা। সূর্য ডোবা পর্যন্ত সমবয়সীদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে। নদীর তীর ধরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ায় তারা।
‘কত বছর মাছ ধরলে সরকার আমাগো জাইল্লা কইব’
ছুঁই ছুঁই সন্ধ্যায় আগুনমুখার তীরে বসে ছিল আট বছর বয়সী সাকিব। সারা দিন মা শেফালি বেগমের (২৫) সঙ্গে আগুনমুখার বুক চষে বেড়িয়েছে ছোট্ট শিশুটি। ওই দিন নদী উত্তাল থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই তীরে ফিরে আসে তারা। গায়ে নীল রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি ও কালো রঙের হাফপ্যান্টে ফুটে উঠেছে সাকিবের মলিনতা। গলায় লটকানো কবিরাজের একটি মাদুলি, দুই হাতে সুতায় তৈরি কিছু বাঁধা।
সাকিবের মা শেফালি বেগম বলেন, তাঁর স্বামী পান্নু মাঝি নানা রোগে আক্রান্ত। নদীতে নৌকা চালাতে হলে একজন সহযোগী বা শ্রমিক দরকার। তাই বাধ্য হয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাছ ধরতে হয় তাঁকে। এতে শ্রমিকের মজুরিও বেঁচে যায় আর ছেলেটিও ধীরে ধীরে কাজ শিখছে।
শেফালি বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘১০ বছর ধরে আগুনমুখা নদীতে মাছ ধরি, বাজারে মাছ বেচি। মানুষ মোরে জাইল্ল্যা কইয়া ডাহে; কিন্তু সরকার আমাগো জাইল্লা কয় না। কত বছর নদীতে মাছ ধরলে সরকার আমাগো জাইল্লা কইব, তালিকায় নামডা উঠাইয়া দেবে? এনজিওরা ঋণ দেয়; কিন্তু সরকার জাইল্লা তালিকায় নামডা উঠায় না।’
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী প্রথম আলোকে বলেন, আগুনমুখা নদীর বোয়ালিয়া প্রান্তে প্রায় অর্ধশত এবং রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রান্তে ১৭৫ জন নারী মাছ ধরা পেশায় জড়িত; কিন্তু তারা স্থলে নয়, নৌকায় বসবাস করেন। এতে তাদের হোল্ডিং নম্বর পাওয়া নিয়ে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়; আর হোল্ডিং না থাকায় তাদের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রত্যয়ন দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া নিয়ে প্রতিবন্ধকতা থাকে। নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জেলে তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। তবে বিশেষ বিবেচনায় এসব অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে কিছু পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যারা বাদ পড়েছে, তাদের আগামীতে দেওয়া হবে।









Bengali (BD) ·
English (US) ·