২৯ ঘণ্টায় ২১৪ কিলোমিটার দৌড়ানো রাজন মিয়ার চোখ এখন ‘আয়রনম্যান মালয়েশিয়া’য়

৬ দিন আগে
যে বয়সে অনেকেই শরীরের যত্ন নিয়ে সতর্ক হয়ে যান, সে বয়সেই তিনি টানা ২৯ ঘণ্টায় ২১৪ কিলোমিটার দৌড়ে তাক লাগিয়েছেন। যে দূরত্বে আমরা রিকশা খুঁজি, তিনি সেখানে সাইকেল চালিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে রাঙামাটি চলে যান। আবার সুযোগ পেলে মঞ্চে নাচেনও।

এই মানুষটির নাম মোহাম্মদ রাজন মিয়া। তিনি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একজন আল্ট্রা রানার, সাঁতারু, সাইক্লিস্ট, উপস্থাপক ও সুবক্তা। শাস্ত্রীয় নৃত্যেও দক্ষতা আছে তার।


ছাত্রজীবনেই গড়া ভিত

রাজন মিয়ার ক্রীড়া-যাত্রা শুরু স্কুলজীবনে। কিশোরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০০৩ ও ২০০৪ সালে সেরা অ্যাথলেট নির্বাচিত হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।


স্যার এ এফ রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত একাধিকবার সেরা অ্যাথলেটের স্বীকৃতি পান। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সেরা অ্যাথলেট নির্বাচিত হন কয়েকবার। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় ১৫০০, ৫০০০ ও ১০,০০০ মিটার দৌড়ে রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তার।


চাকরি জীবনে ‘দ্বিতীয় ইনিংস’

৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষকতা শুরু করেন মোহাম্মদ রাজন মিয়া। অনেকেই যেখানে চাকরি জীবনে ব্যস্ততায় নিজেকে গুটিয়ে নেন, সেখানে তিনি শুরু করেন নতুন অধ্যায়।


২০২০ সালে আল্ট্রা রানের পথে পা, এরপর একের পর এক সাফল্য

২০২১ সালের জানুয়ারি গাজীপুর হাফ ম্যারাথনে (২১ কিমি) পঞ্চম স্থান, কিশোরগঞ্জ ম্যারাথনে (৪২ কিমি) চ্যাম্পিয়ন ও শমসেরনগর আল্ট্রা ম্যারাথনে (প্রথম আল্ট্রা) চতুর্থ স্থান। পরের মাসেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে আখাউড়া ম্যারাথন দ্বিতীয় স্থান, নভেম্বরে ভাওয়াল হাফ ম্যারাথন (২১ কিমি) তৃতীয় স্থান এবং কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ ৫০ কিমি রানে চ্যাম্পিয়ন।


আরও পড়ুন: অদম্য মারিয়ার বিশ্বজয়, অর্থকষ্ট পেরিয়ে ফ্রান্সে লাল-সবুজের জয়গান


২০২২ সালে মৌলভীবাজার হাফ ম্যারাথনে চতুর্থ স্থান। ২০২৩ সালে ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স আয়োজিত বান্দরবান হিল ম্যারাথনে চ্যাম্পিয়ন এবং বান্দরবান ৪২ কিলোমিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন। ২০২৪ সালে বান্দরবান ৫২ কিলোমিটার আল্ট্রা ম্যারাথনে চ্যাম্পিয়ন।


২০২৫ সালে ১২ এপ্রিল রাঙামাটি ২৫ কিলোমিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন, ৫ নভেম্বর বান্দরবান ৫২ কিলোমিটার আল্ট্রা রানে তৃতীয় স্থান, ২১–২২ ডিসেম্বর কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ ১৬১ কিলোমিটার রান দ্বিতীয় স্থান, ২৬–২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম স্টেডিয়াম রানে ২৯ ঘণ্টায় ২১৪ কিলোমিটার দৌড়ে তৃতীয় স্থান এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত হাফ আয়রনম্যানে (১.৮ কিমি সাঁতার, ৯০ কিমি সাইক্লিং, ২১ কিমি দৌড়) তৃতীয় স্থান।


দৌড়ের বাইরে আরেক লড়াই

রাজন মিয়া শুধু দৌড়ান না, সাঁতারেও সমান পারদর্শী। খাগড়াছড়ির চেঙি নদীতে ১১ কিমি সাঁতার, কাপ্তাই লেকে ১২ কিমি সাঁতার সফলভাবে সম্পন্ন এবং ২০২৫ সালে ঢাকায় হাফ আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হন তিনি। যে দেশে সাঁতার না জানার কারণে নিয়মিত মানুষ প্রাণ হারায়, সেখানে দীর্ঘ দূরত্ব সাঁতার কেটে তিনি সচেতনতারও বার্তা দিচ্ছেন।


স্বপ্ন: আয়রনম্যান মালয়েশিয়া

রাজন মিয়ার বড় স্বপ্ন পূর্ণাঙ্গ আয়রনম্যান হওয়া। একটি পূর্ণ আয়রনম্যান ট্রায়াথলনে থাকে- ৩.৮ কিমি সাঁতার, ১৮০.২ কিমি সাইক্লিং ও ৪২.২ কিমি ম্যারাথন। মোট ২২৬.৩ কিলোমিটার একদিনে শেষ করতে হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন একদিনের ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর একটি। এটি সাধারণত মালয়েশিয়ার পর্যটন দ্বীপ লাংকাউইতে অনুষ্ঠিত হয়।


আরও পড়ুন: স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান


পরিশ্রম আর অর্থের মেলবন্ধন

পরিশ্রম ও মানসিক দৃঢ়তায় এগিয়ে থাকলেও রাজন মিয়ার বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক। আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা। তিনি চান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসুক, যাতে দেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারেন।


মানবিক মুখ

শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজন মিয়া নিজ হাতে আচার তৈরি করেন। পরিচিতজনদের কাছে বিক্রি করেন। সেই আয়ের পুরোটা দিয়ে দুইজন শিক্ষার্থীর পড়ালেখার সব খরচ বহন করেন। 


একজন শিক্ষক, যিনি শুধু ক্লাসরুমে নয়, জীবনযুদ্ধেও উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। রাজন মিয়ার গল্প কেবল ক্রীড়া সাফল্যের নয়। এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের গল্প। তার দৌড় শুধু নিজের জন্য নয়, একটি স্বপ্নের জন্য। একটি দেশের নামকে আরও উঁচুতে তোলার জন্য।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন