হরমুজ প্রণালী ছাড়াও যেভাবে টিকে থাকতে পারে চীন

১ সপ্তাহে আগে
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশটিই, আশ্চর্যজনকভাবে, এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার নাগরিকদের বিভিন্ন উপায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানাচ্ছে। আর সেই জায়গায়, চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান সংবাদপত্রটি পাঠকদের বলছে যে দেশটির নিজস্ব ‘শক্তির ভান্ডার’ আছে।

যদিও চীনের ওই সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়নি যে সরবরাহ সংরক্ষণের জন্য বেইজিং অনানুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবু বহু বছরের নীতিগত পদক্ষেপের ফলে চীন তার অনেক প্রতিবেশীর তুলনায় জ্বালানি ধাক্কা থেকে বেশি সুরক্ষিত।

 

চীনের রয়েছে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত যানবাহনের প্রায় সমান বিশাল এক বৈদ্যুতিক গাড়ির বহর, সুবিশাল ও ক্রমবর্ধমান তেলের মজুদ, তেল ও গ্যাসের বৈচিত্র্যময় সরবরাহ এবং এমন একটি বিদ্যুৎ গ্রিড যা দেশীয় কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তির কল্যাণে আমদানি থেকে প্রায় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

 

ফিনল্যান্ডের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লরি মিল্লিভিরতা বলছেন, 

বর্তমান পরিস্থিতি আসলে সেই চিত্রের খুবই কাছাকাছি, যা নিয়ে চীনা পরিকল্পনাবিদরা কয়েক দশক ধরে ভেবে আসছেন।

 

তিনি আরও বলেন, ‘এটি সমুদ্রপথে আসা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টাকে সঠিক প্রমাণ করছে।’ 

 

আরও পড়ুন: যেভাবে ইরানের খারগ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

 

বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থান

 

২০২০ সালের শেষ দিকে বেইজিং ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন গাড়ি বিক্রির ২০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। গত বছর নাগাদ, মোট নতুন গাড়ির অর্ধেক বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়ে যায়।

 

বৈদ্যুতিক গাড়ির এই অপ্রত্যাশিত উত্থানের অর্থ হলো, কয়েক দশক ধরে চলা দ্রুতগতির বৃদ্ধির পর চীনের জ্বালানি ব্যবহার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার চেয়ে দেশটি এখন কম তেল পোড়াচ্ছে ও আমদানি করছে।

 

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর হিসাব অনুযায়ী, গত বছর বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে যে পরিমাণ তেল ব্যবহৃত হয়নি, তা চীন সৌদি আরব থেকে যে পরিমাণ তেল আমদানি করত তার প্রায় সমান। 

 

সুরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা

 

চীনের বিদ্যুৎ গ্রিড প্রায় পুরোপুরি চালিত হয় কয়লা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির এই প্রবৃদ্ধি বেইজিংয়ের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রতি বছর অর্থনীতির বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় সবটাই নতুন সৌর বা বায়ুশক্তি থেকে পূরণ হচ্ছে।

 

এর ফলে কয়লা আমদানি কমছে এবং উপকূলীয় কিছু প্রদেশে ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রয়োজনও কমে যাচ্ছে। 

 

তেলের উৎস অনেক, নির্ভরতা কম

 

চীন বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করলেও, অন্যান্য বড় এশীয় আমদানিকারকদের মতো কোনো একক সরবরাহকারীর ওপর তারা নির্ভরশীল নয়।

 

উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়। দেশটি সাধারণত তার প্রায় ৮০ শতাংশ তেল সৌদি এবং আমিরাত থেকে আমদানি করে। বিপরীতে, চীন একই অনুপাতের তেল আটটি দেশ থেকে সংগ্রহ করে, যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে ছাড়মূল্যের তেল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অধিকাংশ ক্রেতার প্রবেশাধিকার নেই। 

 

এই আমদানির একটি অংশ চীন তার ‘গোপনীয় কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতে’ সংরক্ষণ করে। এই মজুতের সঠিক পরিমাণ জানা না গেলেও, বাণিজ্যিক মজুতের সঙ্গে মিলিয়ে ধারণা করা হয় যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় সাত মাস পর্যন্ত তা দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব। 

 

আরও পড়ুন: পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে চায় ইরান, কারণ কী?

 

দেশীয় উৎপাদনও বাড়ছে

 

গত বছর চীন দৈনিক ৪.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা একটি নতুন রেকর্ড এবং মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান। তবে দেশটির তেলের মজুত কমে আসছে এবং চীনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শেল অয়েল বুমের পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়।

 

তবে গ্যাসের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। দেশীয় উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানিকৃত গ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে চীন এখন ২০২০ সালের তুলনায় কম এলএনজি আমদানি করছে।

 

চীনের বিস্তৃত পাইপলাইন নেটওয়ার্ক তাকে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে এবং রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মিয়ানমার থেকে তেল ও গ্যাস সংগ্রহের সুযোগ দিচ্ছে। এছাড়াও আরেকটি রাশিয়া-চীন পাইপলাইন, ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’-এর জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে এটি সম্পন্ন হতে এখনও কয়েক বছর বাকি। 

 

আরও নিরাপদ ভবিষ্যৎ

 

কয়েক দশক ধরে চীনের প্রবৃদ্ধি বিদেশ থেকে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যাপক প্রসারের ফলে চীন এখন ধীরে ধীরে সেই নির্ভরতা থেকে সরে আসছে।

 

রাইস্ট্যাড এনার্জির তেল ও গ্যাস গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট চেন লিন বলেন, ‘চীনের তেলের চাহিদা এ বছর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে এরপর কমতে পারে। তাই আমদানির অংশ বেশি থাকলেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা কম।’

 

সূত্র: রয়টার্স

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন