সিলেটাঞ্চলের রেলপথে বাঁকে বাঁকে ‘মৃত্যুফাঁদ’

১ সপ্তাহে আগে
দুর্ঘটনা ঘটলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকছে রেলসেবা। এতে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ও যাত্রী ভোগান্তির পাশাপাশি লোকসান গুনতে হয় সরকারকেও। তবে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারের পর যেন সবই বেমালুম ভুলে যাওয়া। ঘটনার বিশ্লেষণ না হওয়ার শঙ্কা তো আছেই, দুর্ঘটনার কারণ জানা গেলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চলে গড়িমসি। এমন বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে চান না সিলেট অঞ্চলের রেলের দায়িত্বশীলরা।

গত কয়েক বছরে সিলেট অঞ্চলে রেলের একের পর এক দুর্ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছে সময় সংবাদ, চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে এ অনুসন্ধানে।


রেলওয়ের তথ্যমতে, ১৮৯১ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে বাংলার পূর্বদিকে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করে, ১৯১২ থেকে ১৫ সালে চালু হয় সিলেট রেলওয়ে স্টেশন।


সেই ব্রিটিশ আমলের নির্মিত লাইনে কিছুটা সংস্কার করেই প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলের সিলেট-রেলপথে চলছে ৬ জোড়া আন্তঃনগর ও ১ জোড়া মেইল ট্রেন। এ অঞ্চলের মানুষের দাবি থাকলেও গেল ৫০ বছরের বেশি সময়েও স্থাপন করা যায়নি ডুয়েল লাইন রেল সেবা। এতে কিছুদিন পরপরই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকছে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ। ভোগান্তিতে পরছেন যাত্রীরা, উদ্ধার কাজেও হাপিয়ে উঠতে হচ্ছে শ্রমিকদের।


রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে লাইন মেরামত ও আনুষঙ্গিক সংস্কার কাজে ব্যয় হয়েছে ১৫ কোটি টাকার বেশি।


তবে প্রকৌশল বিভাগ মৌখিকভাবে এমন খরচ উল্লেখ করলেও রেলওয়ে কর্মীরাই বলছেন রেলপথ সংস্কারে তেমন গুরুত্ব দিয়ে নেয়া হয়নি উদ্যোগ। চোখে পড়েনি মেরামতের টেকসই কোনো কাজ, উল্টো বিস্তর অনিয়মের অন্ত নেই।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট রেলওয়ের একজন ওয়েম্যান বলেন, ‘চলন্ত ট্রেন রেল লাইন থেকে ছিটকে পরার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে লাইনে কাজ না হওয়া, লাইন টেম্পিং হয় না ঠিকমতো, একটা টেম্পিং মেশিন বছরের পর বছর ধরে দেখাই যায় না, কাজ কীভাবে হবে? শ্রমিকরা সনাতন পদ্ধতিতে কত কিলোমিটার লাইন ঠিক করবে?’


আরও পড়ুন: ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ


দুর্ঘটনা হলেই লাইন টেম্পিংকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখলেও যথাযথ রেলপথ টেম্পিং কেবল কাগজেপত্রেই সীমাবদ্ধ বলে জানান রেলওয়ের এই  কর্মী।


সময় সংবাদের অনুসন্ধান বলছে- সিলেটে গত ৫ বছরে ১৫টি রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২০ যাত্রীর, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫ শতাধিক।

সিলেটে গত ৫ বছরে ১৫টি রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২০ যাত্রীর, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫ শতাধিক। ছবি: সময় সংবাদ


সিলেট-আখাউড়া ১৭৮ কিলোমিটার রেলপথে ২০১৯ সাল থেকে এসব দুর্ঘটনায় যাত্রী ভোগান্তি ছাড়াও এই রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। এতে টিকেট রিফান্ডসহ লোকসান গুনতে হয়েছে লাখ লাখ টাকা।


দুর্ঘটনার তারিখ, ঘটনাস্থল ও ট্রেনসমূহ
 

২০১৯ সালের ২৩ জুন বরমচাল এলাকায় উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় ৪ যাত্রী নিহতসহ ওই বছরেরই ১১ নভেম্বর উদয়ন ও তুর্ণা নিশিথা দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৬ যাত্রীর। ৪ অক্টোবর আখাউড়ায় ও ১৭ সেপ্টেম্বর মাইজগাও এলাকায় লাইনচ্যুত হয় জালালাবাদ এক্সপ্রেস। ৪ সেপ্টেম্বর ফেঞ্চুগঞ্জের মল্লিকপুরে এবং ১৬ আগস্ট ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও রেলস্টেশনে উপবন এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়।


একই বছরের ১৯ জুলাই জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস কুলাউড়া স্টেশনে লাইনচ্যুত হয়। পরদিন ২০ জুলাই একইস্থানে লাইনচ্যুত হয় কালনী এক্সপ্রেস। ২৩ জুন উপবন এক্সপ্রেস বরামচালে দুর্ঘটনার আগেও ১৬ মে মল্লিকপুর এলাকায় লাইনচ্যুত হয়েছিল।


সবশেষ গত বছর ফেঞ্চুগঞ্জের কোটালপুরে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ও চলতি বছরে শিববাড়ি এলাকায় তেলবাহী ওয়াগন দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের।


এত দুর্ঘটনায় দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারে প্রাচীনতম পদ্ধতি অনুসরণের কারণে রেল চলাচল স্বাভাবিক করতে লেগেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।


সিলেট রেলওয়ের স্টেশন ম্যানাজার নুরুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, ‘এসব দুর্ঘটনায় পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার ট্রেনগুলোতে ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি আটকে পরা যাত্রীদের ক্ষোভ পৌঁছেছে চরমে, লোকসান গুনতে হয়েছে লাখ লাখ টাকা।’


আরও পড়ুন: ‘বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের’ ২ বগি লাইনচ্যুত, রেল যোগাযোগ বন্ধ


আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু রেলপথ মেরামতে টেম্পিং মেশিনটি নিয়মিত কাজ করার কথা। তবে নানা ত্রুটি সমস্যা থাকায় মেশিনটি ঢিমেতালে কাজ করায় পূর্বাঞ্চলের শত শত কিলোমিটার রেল লাইন টেম্পিং করতে রীতিমতো হিমশিম অবস্থা বলছেন রেল কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক রেলওয়ে কর্মী বলেন, ‘আমাদের কাজ করার যন্ত্রপাতিও ঠিকমতো পাচ্ছি না, সাবল থেকে শুরু করে লাইন ঠিক করার ম্যানুয়াল জিনিসপত্র নিজেরাই ঘষামাজা করে ঠিক করে নিতে হয়। এগুলো দিয়েই চোখের অনুমান ও মাপঝোঁক করে লাইন ঠিক করার চেষ্টা করি আমরা। কিন্তু মেশিন দিয়ে টেম্পিং করা হলে খুব দ্রুত ও সঠিকভাবে রেললাইন মেরামত করা যেত। মেশিনটা বছর পার হয়ে যায় চোখেই দেখি না, লাইনের খারাপ অবস্থা থাকলে রেলগাড়ি তো পরবোই।’


প্রয়োজনীয় মেরামত না করে নামকাওয়াস্তে কাজ চালানোর কথা উঠে এসেছে রেলওয়ের আরেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্যে, তিনিও নিজের পরিচয় গোপন রেখে কথা বলতে চাইলেন। বললেন, ‘লাইনে কাজের কাজ কিছুই হয় না, গত কয়েক বছরে কি কাজ হয়েছে? ওয়েম্যানের কাজ যদি দেয়া হয় মাস্টার্স পাস পোলাপানরে হে কি কাজ করবো? পরীক্ষা দিয়া এইসব কাজে লোক নেয়? এসব কাজ হইলো শ্রমজীবী মানুষের, অনার্স-মাস্টার্স কইরা আইসা পোলাপান এইসব করবো? অর্ধেকই তো কাজ ফালাইয়া চইল্যা গেছে, এখন লোক সংকট দেখা দিছে, কাজ করবো কেডা?’


তিনি আরও বলেন, ‘ওয়েম্যান থেকে কিছুদিন পরে কি ম্যান প্রমোশন হইবো, আরও অর্ধেক কমে যাইবো শ্রমিকের সংখ্যা, তার উপরে টেম্পিং মেশিন পুরো পূর্বাঞ্চলে ২টা, তার মধ্যে ওই মেশিনও নানা সমস্যা নিয়া চলে, কাজের কাজই হইতেছে না এক কথায়, রেলগাড়ি তো পড়বেই।’


এদিকে, রেলপথ ও অন্যান্য সংস্কার কাজে গেলো কয়েক বছরে সিলেটে ১৫ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে বলে মৌখিকভাবে উল্লেখ করলেও ব্যয়খাতের কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা, জানালেন সংস্কার কাজে পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহও না থাকার কথা।


আরও পড়ুন: কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না রেল দুর্ঘটনা


রেলওয়ে সিলেটের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ মো. আজমাঈন মাহতাব সময় সংবাদকে বলেন, ‘গত ৫ বছরে উন্নয়ন কাজ বলতে কিছুই হয়নি রেলপথে, যা হয়েছে তা শুধু কোনোরকমে মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা, আমরা যদি পুরোনো লাইনকে রেখে পাশে আরেকটা নতুন লাইন স্থাপন করতে পারতাম তাহলে নতুন লাইনে রেল চলাচল করলে আবার পুরোনো লাইনটাকে নতুনভাবে বসানো যেতো। দুইটা লাইন হলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাই কমে যেতো। আমরা ৫ বছরে আনুষঙ্গিক সংস্কার কাজে অনুমান ১৫ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছি। এরমধ্যে রেল লাইন থেকে শুরু করে অন্যান্য সংস্কারও রয়েছে। তবে সিলেট অঞ্চলের মানুষের যে দাবি তা পূরণে সরকার যে ব্যবস্থা নেয় সে অনুযায়ী আমরা কাজ করতে বদ্ধপরিকর।’


উল্লেখ্য, সিলেট রেলপথ সংস্কারে ২০২০ সালে ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়ার আশ্বাস থাকলেও চীনা কোম্পানি সরে আসায় তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তাই সিলেট অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ডুয়েল লাইন রেলসেবার স্বপ্ন এখনও অধরা। কিছুদিন পরপর ঘটছে দুর্ঘটনা, এতে ভোগান্তিতে এ অঞ্চলের কোটি মানুষ।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন