সমুদ্রের ঢেউকে সঙ্গী করে তাই এবার প্রত্যাশার পারদ ছিল অনেক উঁচুতে। আর সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন দুই সার্ফার। পুরুষ বিভাগে মোহাম্মদ মান্নান এবং নারী বিভাগে ফাতেমা আক্তার। লাল-সবুজের পতাকা হাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রমাণের পথে এখন তারা বাংলাদেশের নতুন মুখ।
মোহাম্মদ মান্নানের সার্ফিং যাত্রা একদিনে গড়ে ওঠেনি। প্রায় ১২ বছরের কঠোর অনুশীলন, সংগ্রাম আর স্বপ্ন তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এবারের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে মান্নান বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের ৮ম জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্ট ছিল আরও সুশৃঙ্খল ও উন্নত আয়োজন।
তার ভাষায়, ‘সার্ফিংয়ে ঢেউটাই আসল। এবারের সার্ফিং টুর্নামেন্টের সময় নির্বাচনটা ছিল একদম সঠিক সময়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দারুণ ঢেউ পেয়েছি। যা আমাদের পারফরম্যান্সে বড় ভূমিকা রেখেছে।’
প্রথম রাউন্ড থেকে সেমিফাইনাল-প্রতিটি ধাপেই নিজের আধিপত্য দেখিয়েছেন মান্নান। এখন তার লক্ষ্য একটাই-এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে সেরাটা দেয়া।
তবে সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেছেন বাস্তবতাও। আর্থিক সহায়তা, মানসম্মত সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের অভাব এখনো বড় বাধা। তার বিশ্বাস, এসব ঘাটতি দূর হলে বাংলাদেশ সার্ফিংয়েও একদিন অলিম্পিক মঞ্চে শিরোপা অর্জন করতে পারবে।
৮ম জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্টে ১৩ জন তরুণী সার্ফারকে হারিয়ে নারী বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ফাতেমা আক্তার। তবে ফাতেমা আক্তারের গল্পটাও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়। কক্সবাজার পৌরসভার ঘোনারপাড়ার মেয়ে, পড়াশোনার পাশাপাশি সার্ফিংই তার সবচেয়ে প্রিয় জগৎ।
ফাতেমা চান, ফুটবল-ক্রিকেটের মতো সার্ফিংও বাংলাদেশে জনপ্রিয় হোক। ‘দেশ-বিদেশের মানুষ আমাদের সার্ফিংকে চিনুক, আমাদের দেশে এসে খেলুক’-এটাই তার স্বপ্ন।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ার উত্তাল সমুদ্রে বাংলাদেশের জয়গান
ইতোমধ্যে মালদ্বীপ ও ভারতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন ফাতেমা আক্তার। বড় ঢেউ, ভিন্ন পরিবেশ-সবকিছুই তাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
২০২৬ সালের এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়া তার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। এখন তার লক্ষ্য-বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সার্ফিংয়ের মাধ্যমে দেশের নাম উজ্জ্বল করা।
এদিকে অনেক সংকটের মাঝেও বাংলাদেশের সার্ফিং এবং সার্ফারদের এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন। তাদের একজন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন।
তিনি মনে করেন, মান্নান ও ফাতেমা দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাদের ঘিরে রয়েছে বড় পরিকল্পনা।
এশিয়ান গেমস সামনে রেখে শুধু অংশগ্রহণ নয়, ভালো ফল করাই লক্ষ্য। এজন্য বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের সমুদ্রের ঢেউ তুলনামূলক ছোট-যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বড় ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে হয়।
বড় ঢেউয়ের অভ্যস্ত না হওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা’, বলেন তিনি। ‘তাই আমরা চাই, বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের মানসিক ও কারিগরি প্রস্তুতি বাড়াতে।’
একই সঙ্গে ব্যাকআপ খেলোয়াড় তৈরির দিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদেরও নিয়মিত অনুশীলনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাে ভবিষ্যতে শক্তিশালী দল গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে সার্ফিং এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, তরুণদের আগ্রহ এবং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা আয়োজন- সবমিলিয়ে এটি হতে পারে দেশের নতুন ক্রীড়া শক্তি।
মান্নান ও ফাতেমার মতো তরুণদের হাত ধরে সেই স্বপ্ন এখন আরও স্পষ্ট। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি। ঢেউয়ের পর ঢেউ পেরিয়ে তারা এখন এগিয়ে চলেছেন বিশ্বমঞ্চের দিকে-লক্ষ্য একটাই, লাল-সবুজের পতাকাকে উড়িয়ে দেয়া নতুন উচ্চতায়।

১ সপ্তাহে আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·