সস্তা ড্রোন বনাম দামি ক্ষেপণাস্ত্র: ইরান যুদ্ধে জয়ের চাবিকাঠি এখন খরচের হিসাব

৬ দিন আগে
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের জবাবে ইরান তুলনামূলক কম দামের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ব্যবহার করছে। কিন্তু সেগুলো ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বহু মিলিয়ন ডলার দামের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হচ্ছে।

এতে প্রতিরক্ষার খরচ অনেক দ্রুত বাড়ছে এবং দীর্ঘ যুদ্ধ হলে এটি বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কম দামের ড্রোন আর খুব ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের খরচের পার্থক্যই এই যুদ্ধে কে এগিয়ে থাকবে তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

 

ইরানের পবিত্র শহর কম–এর কাছে একটি সড়কে দ্রুতগতিতে চলছিল একটি ট্রাক, যার ভেতরে ছিল এক প্রাণঘাতী অস্ত্র। একটি ঝাপসা সাদা-কালো ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাকটি ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায়।

 

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্রটি ট্রাকটিতে আঘাত হানছে এবং বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে ধোয়া উড়ছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করে, ট্রাকটিতে একটি লঞ্চার তথা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ‘হামলার জন্য প্রস্তুতি’ নিচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) তারা সামাজিক মাধ্যমে এর ধ্বংসের ভিডিও প্রকাশ করে।

 

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই তারা ইরানের ৩০০–এর বেশি লঞ্চার ধ্বংস করেছে। তাদের মতে, এই অভিযানের ফলে ইরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ইরান হয়তো এখনই তাদের আরও উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করছে না এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখছে।

 

আরও পড়ুন: মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে এবার ড্রোন হামলা, দাবি ইরানের

 

এই যুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, ড্রোনও বড় ভূমিকা রাখছে। ইসরাইলি ও মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরান ঝাঁকে ঝাঁক ড্রোন ব্যবহার করছে, যার লক্ষ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা।

 

আর এখানেই অর্থ ও উপাদানে একটি বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ইরানের একটি ড্রোনের দাম প্রায় ২০ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র ২৪ লাখ টাকা) হলেও এগুলো ভূপাতিত করতে যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা।

 

এ কারণে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও গালফ তথা উপসাগরীয় দেশগুলোর মজুদে থাকা এই ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর শেষ হয়ে যেতে পারে, যখন ইরানের কাছে এখনও অনেক ড্রোন অবশিষ্ট থাকবে।

 

চলতি সপ্তাহে বিশ্লেষক আমোস ফক্স ও ফ্রান্জ-স্টেফান গ্যাডি ফরেন পলিসি-তে লিখেছেন, ‘হামলাকারীরা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল) এমন এক দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধে জড়াতে চায় না যেখানে প্রতিদিন শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ হবে এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে হারার বদলে যদি প্রতিরক্ষা অস্ত্রই শেষ হয়ে যায়, তাহলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

 

আরও পড়ুন: গালফে ইরানি ড্রোন ঠেকাতে ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: জেলেনস্কি

 

যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলে ধারণা করেছিল ইসরাইল। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ইব্রাহিম জালালের মতে, গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে এখন পর্যন্ত ইরান ইসরাইল ও গালফ অঞ্চলের দিকে ৮০০-র বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ১৬০০ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

 

এদিকে গালফ দেশগুলো ইরানি হামলা ঠেকাতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তেকে নতুন ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর অপেক্ষায় রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্রাড কুপার জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে এবং ড্রোন হামলা কমেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।

 

উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা বলা যায়। যুদ্ধের প্রথম দিনে দেশটির দিকে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র সাতটিতে। একইভাবে ড্রোন হামলাও ২০৯ থেকে কমে ১৩১-এ নেমেছে।

 

তবে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই প্রতিহত করা হলেও ধ্বংসাবশেষ পড়ে ভবন ও অবকাঠামোর কিছু ক্ষতি হচ্ছে। বড় ধরনের প্রাণহানি সাধারণত তখনই হয় যখন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। যেমন জেরুজালেমের কাছে একটি সিনাগগে হামলায় নয়জন নিহত হন। অন্যদিকে তীব্র হামলার পরও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

 

ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো ব্যয়বহুল

 

মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হলেও এর খরচ অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে নিক্ষেপ করা প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫ কোটি টাকা)।

 

এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রায়ই ‘একটি গুলি দিয়ে আরেকটি গুলিকে আঘাত করা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়। লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিতভাবে ভূপাতিত করতে সাধারণত অন্তত দুটি ইন্টারসেপ্টর ছোড়া হয়, ফলে খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।

 

আরেকটি বড় সমস্যা হলো উৎপাদনের গতি। হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ইন্টারসেপ্টর অনেক কম হারে তৈরি হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরান প্রতি মাসে আনুমানিক ১০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, অথচ একই সময়ে মাত্র ছয় বা সাতটি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করা সম্ভব।

 

সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন দ্রুত না বাড়ালে ভবিষ্যতের কোনো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান মজুদ ও উৎপাদন হার যথেষ্ট নয়।

 

আরও পড়ুন: আজারবাইজানে ড্রোন হামলা করল কারা?

 

আরেকটি উদ্বেগ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করলে ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের মজুদ কমে যেতে পারে, যা চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে আরও বেশি প্রয়োজন হতে পারে।

 

যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার জানিয়েছে যে, তাদের ইন্টারসেপ্টর শেষ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি। একইসঙ্গে ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ‘প্রায় সীমাহীন সরবরাহ’ রয়েছে।

 

তবে ড্রোন হামলা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সংখ্যায় অনেক বেশি ড্রোন একসঙ্গে আক্রমণ করলে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে যেতে পারে। এগুলো সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় ভূগর্ভস্থ গুদামে লুকিয়ে রাখাও সহজ।

 

আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ড্রোনের দাম ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম, যা এই যুদ্ধে বড় ধরনের অসমতা তৈরি করছে। 

 

ড্রোন যুদ্ধে ইউক্রেনের ভূমিকা 

 

ইউক্রেন এখন অনেকের কাছে ড্রোন যুদ্ধের ‘ব্যবহারিক ল্যাবরেটরি’ হিসেবে পরিচিত। এখানে সামরিক কৌশলবিদরা রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে নানা ধরনের প্রতিরোধ পদ্ধতি তৈরি করেছেন। রাশিয়া যেসব ড্রোন ব্যবহার করছে তার মধ্যে রয়েছে ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোন।

 

একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি হলো সড়কে টহল দেয়া। এতে সেনারা পিকআপ ধরনের গাড়ি (হিলাক্স ধাঁচের) ব্যবহার করে, যার পেছনে মেশিনগান বসানো থাকে। সেগুলো দিয়ে আকাশে থাকা ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে ভূপাতিত করা হয়।

 

ইউক্রেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি তৈরি করেছে—ইন্টারসেপ্টর ড্রোন। এগুলো শাহেদ ড্রোনের চেয়ে দ্রুত উড়তে পারে এবং কাছে গিয়ে ধাক্কা মেরে ধ্বংস করতে পারে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের দাম একটি শাহেদ ড্রোনের দামের চার ভাগের এক ভাগেরও কম হতে পারে। এ কারণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইউক্রেন অস্ত্র বিনিময়ের ব্যাপারে আগ্রহী।

 

আরও পড়ুন: ইরানের অনেক ড্রোন আটকাতে সক্ষম নয় মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ট্রাম্প প্রশাসন

 

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংক ট্যাংক ব্রুজেল–এর গবেষক জ্যাকব ফাঙ্ক কার্কইগার্ড বলেন, ‘কম খরচে ইরানের ড্রোন মোকাবিলায় কার্যকর সস্তা ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরি করেছে কেবল ইউক্রেনই। এতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরগুলোকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বড় হুমকি মোকাবিলার জন্য সংরক্ষণ করা যাবে।’

 

তার মতে, গালফ অঞ্চলের ধনী দেশগুলো ও মিত্রদের কাছ থেকে এই প্রযুক্তির চাহিদা তৈরি হওয়ায় ইউক্রেনের জন্য এটি বড় কূটনৈতিক সুযোগও তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে কিয়েভ নিজেদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র পাওয়ার জন্য দরকষাকষি করতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে থাকবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে কে আগে ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা খরচের হিসাব’ সমাধান করতে পারে তার ওপর। 

 

তথ্যসূত্র: ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন