তাদের দাবি, আমরা তাদের সাথে ঈদ না করে রোজা রেখেছি, আমরা নাকি ঈদের দিনে রোজা রেখে হারাম কাজ করছি। সুতরাং আমরা কবিরা গুনাহে লিপ্ত।
আমরা জানবো কারা শরীয়তের হুকুম অমান্য করে গুনাহে লিপ্ত। আমরা কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করবো।
১ম বিষয়: আমরা জানি ইসলামের বিধান হচ্ছে- চাঁদ দেখা কিংবা নিকটতম এলাকা থেকে চাঁদের সংবাদ পাওয়া।
তাহলে গতকাল ১৯ শে মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার ২৯ রোজার দিনে বাংলাদেশের কোন স্থানে চাঁদ দেখা যায়নি। এমনকি ভারতসহ বাংলাদেশের আশেপাশের কোন অঞ্চলেও চাঁদ দেখা যায়নি। তাই আমরা রোজা রেখেছি। তাহলে আমরা কিভাবে গুনাহগার হলাম?
বরং যারা চাঁদ না দেখে ও নিকটবর্তী অঞ্চলের চাঁদের সংবাদ না নিয়ে আজ ২০ শে মার্চ বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন করেছে তারাই শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করেছে এবং রোজার দিনে ঈদ করে কবিরা গুনাহ করেছে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত বড় কবিরা গুনাহ। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَنْ أَفْطَرَ يَوْمًا مِنْ رَمَضَانَ مِنْ غَيْرِ رُخْصَةٍ وَلاَ مَرَضٍ لَمْ يَقْضِ عَنْهُ صَوْمُ الدَّهْرِ كُلِّهِ وَإِنْ صَامَهُ
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন ওজর বা রোগ ছাড়া রামাযান মাসের একটি রোযা ভেঙ্গে ফেলে, তার পুরো জিন্দেগীর রোযা দিয়েও এর ক্ষতিপূরণ হবে না। যদিও সে জীবনভর রোযা রাখে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৭২৩)
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা! তারা প্রত্যেক বছর সমগ্র বিশ্বে একই দিনে ঈদ করার নামে সৌদির সাথে তাল মিলিয়ে একটি রোজা নষ্ট করছে, এবং রোজার দিনে মানুষকে ঈদ পালন করিয়ে কবিরা গুনাহে লিপ্ত করছে। সারা জীবন রোজা রাখলেও তো ওই একদিনের রোজার ক্ষতিপূরণ হবে না।
২য় বিষয়: তারা রমজানের শুরুতেও শরীয়তের বিধান অমান্য করে একদিন আগেই রোজা শুরু করে দিয়ে কবিরা গুনাহ করেছিল। অথচ এ সম্পর্কে হাদিসে কঠোর বাণী বর্ণিত হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لاَ تَتَقَدَّمُوا الشَّهْرَ بِصِيَامِ يَوْمٍ وَلاَ يَوْمَيْنِ إِلاَّ أَنْ يُوَافِقَ ذَلِكَ يَوْمًا كَانَ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা রমযান মাস আগমনের একদিন বা দুই দিন আগে রোজা শুরু করে দেবে না। তবে হ্যাঁ, তোমাদের কেউ যদি পূর্ব থেকেই নিয়মিত রোজা পালন করত এবং তার সাথে এই সময়ের মিল হয়ে যায় তবে সেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং ২১৭৮)
সুতরাং যারা নিজ অঞ্চলে চাঁদ না দেখে দূরবর্তী অঞ্চল সৌদির সাথে আমাদের দেশের একদিন আগেই রোজা শুরু করে শরিয়তের বিধান অমান্য করেছে। তারাইতো গুনাহের কাজ করছে।
৩য় বিষয়: তাদের বিভিন্ন দাবী -
তাদের কেউ বলে- পৃথিবীর কোন এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলেই সমগ্র পৃথিবীর সবাইকে তা মেনে রোজা ঈদ করতে হবে।
তাদের কেউ কেউ বলে সৌদিতে চাঁদ দেখা গেলেই সমগ্র পৃথিবীর সবাইকে তা মানতে হবে।
আবার তাদের কেউ কেউ বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে তৈরি লুনার ক্যালেন্ডার বা হিজরী ক্যালেন্ডার এর হিসাব মোতাবেক সবাইকে রোজা ঈদ পালন করতে হবে।
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা! এ সকল মতগুলো ইসলামের বিধান নয়; বরং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। রোজা-ঈদের ক্ষেত্রে চাঁদ দেখা, মাস পূর্ণ করা বা নিকটবর্তী এলাকার সংবাদ পাওয়াই ইসলামের নিদের্শ। আর সমগ্র বিশ্বের মুসলমানগন তা মেনে চলছে।
যেমন দেখুন -
১৯ মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার আফগানিস্তান, নাইজার ও মালি মুসলমানগন চাঁদ দেখার ভিত্তিতে ঈদ পালন করেছে।
২০ মার্চ মধ্যপ্রাচ্য সহ অধিকাংশ দেশে ৩০ রোজা পূর্ণ করে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে এবং ওমানের মুসলমানরা ২৯ রোজার শেষে চাঁদ দেখে ঈদ উদযাপন করছে।
আর আগামীকাল ২১ মার্চ শনিবার পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, মায়ানমার সহ আরও অনেক দেশে ৩০ রোজা পূর্ণ করে ঈদ হবে ইনশাআল্লাহ।
এতেই প্রতিয়মান হয় পৃথিবীর সকল দেশের মুসলমানগন শরিয়তের নিয়মেই রোজা-ঈদ পালন করে যাচ্ছে। তারা সবাই হকের উপর আছেন। এর ব্যতিক্রম যারা করছে তারাই ভুলের উপর আছে।
৪র্থ বিষয়: সমগ্র পৃথিবীর মানুষ কেউ কারোর সাথে তাল মিলিয়ে ঈদ করেনি। সৌদিরা আফগানদের সাথে তাল মেলায়নি। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু মুসলমানদের চিত্র বিভ্রান্তিকর।
চাঁদপুরের ৭ জন আফগানদের সাথে মিলিয়ে ১৯ শে মার্চ ঈদ করেছে। আবার নিজেদেরকে সত্য ও হকের উপর প্রতিষ্ঠিত আছে বলে মনে করছে।
আজ ২০ মার্চ ৭ বা ১৪ হাজার মানুষ সৌদির সাথে মিলিয়ে ঈদ করেছে। আর নিজেদের হকপন্থী দাবি করছে।
এবার আপনারাই বলুন কারা সঠিক বিষয়ের উপর অটল রয়েছে!
পুরো বিশ্বের মানুষ ভুলের উপর আর চাঁদপুরের ঐ ৭ জন যারা আফগানদের সাথে মিলিয়ে ঈদ করেছে তারা হকের উপর, অথবা ৭ হাজার বা ১৪ হাজার মানুষ যারা সৌদি আরবের সাথে ঈদ পালন করেছে তারা হকের উপর, নাকি সমগ্র বিশ্বের মুসলমানগন হকের উপর আছেন?
অথচ তারা নিজ অঞ্চলের মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রোজা ঈদ পালন করলো। আর স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রোজা ঈদ পালন করার ব্যাপারে হাদীস শরীফে সতর্ক করা হয়েছে। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
الصَّوْمُ يَوْمَ تَصُومُونَ وَالْفِطْرُ يَوْمَ تُفْطِرُونَ وَالأَضْحَى يَوْمَ تُضَحُّونَ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যেদিন তোমরা সবাই রোযা পালন কর সে দিন হল রোযা। যেদিন তোমরা সবাই রোযা ভঙ্গ কর সে দিন হল ঈদুল ফিতর। আর যেদিন তোমরা সবাই কুরবানী কর সে দিন হল ঈদুল আযহা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৬৯৭)
তারা এ হাদীসের অপব্যাখ্যা করে বলে যে, "তোমরা" বলতে সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানকে বোঝানো হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীর মুসলমান একই দিনে রোজা ঈদ পালন করা তো অসম্ভব বিষয়। তাই এখানে প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদেরকে বুঝানো হয়েছে।
সর্বস্তরের মুসলমান এবং যারা দূরবর্তী দেশের সাথে তাল মিলিয়ে ঈদ উদযাপন করে- তাদের কাছে বিনীত নিবেদন -
আপনারা সুস্পষ্ট ভুলের উপর রয়েছেন। আপনারা শরিয়তের নির্দেশ অমান্য করে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের পথ ও মত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন পথের পথিক হচ্ছেন। যা কোনোভাবেই ইসলামের স্বতঃসিদ্ধ পথ নয়। তাই সঠিক পথে ফিরে আসুন। আসুন শরীয়ত ও সুন্নাহের পথে।হাজার বছর ধরে মুসলিমদের অনুসৃত পথের দিকে।
আমরা আপনাদেরই স্বজাতি। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।
আলহামদুলিল্লাহ আমাদের দেশে লক্ষাধিক আলেম রয়েছেন। তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করুন। নিজেদের একজন পীর বা একজন মৌলভীর সিদ্ধান্তে শরীয়তের বিধান থেকে সরে যাবেন না। বরং ৫০ জন আলেমকে জিজ্ঞেস করে সঠিক মাসালার উপর চলতে চেষ্টা করবেন। ফিতনার এ যুগে শরীয়তের মাসআলা মাসায়েলের ব্যাপারে একজনের উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।
খেয়াল রাখবেন! কাদের থেকে শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল নিচ্ছেন! তারা কি সত্যিই শরীয়তের মাসআলা মাসায়েল সম্বন্ধে অবগত! তারা কি যথাযথভাবে উপযুক্ত শিক্ষকদের থেকে দ্বীন ইসলাম এর শিক্ষা লাভ করেছেন?
মুসলিম শরীফের ভূমিকা বিখ্যাত তাবি'ঈ ইবনে সীরিন রহ এর প্রসিদ্ধ উক্তি বর্ণনা করেন-
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، قَالَ إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِينٌ فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ
নিশ্চয়ই এ ইলম হলো দ্বীন। কাজেই কার কাছ থেকে তোমরা দীন গ্রহণ করছে তা যাচাই করে নাও। (অর্থাৎ সত্যবাদী, দ্বীনদার এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে ইলমে দীন শিক্ষা করা প্রয়োজন।) আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বিষয় বুঝার তৌফিক দান করুন।
লেখক: শিক্ষক, জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ ঢাকা। খতিব, আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ
পরিচালক দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশ।

৩ সপ্তাহ আগে
৬








Bengali (BD) ·
English (US) ·