ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে অন্যের গাড়ি বিক্রি, সাংবাদিক-ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে দম্পতির প্রতারণা

৩ সপ্তাহ আগে
প্রতারক দম্পতি সাইফুল ইসলাম ও রাজিয়া সুলতানা। স্বামী সাইফুল নিজেকে টিভি চ্যানেলের মালিক হিসেবে পরিচয় দেন, আর স্ত্রী রাজিয়া নিজেকে পরিচয় দেন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। তারা ভাড়া বা টেস্ট ড্রাইভের নামে শো-রুমের গাড়ি নিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিক্রি করেন। গত তিন বছরে এভাবে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে একটি গাড়ির শোরুমে উপস্থিত হন এক ব্যক্তি। গাড়িতে বিভিন্ন মিডিয়ার স্টিকার লাগানো ছিল। তিনি নিজেকে ই-টেন টেলিভিশনের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে গাড়ি বিক্রির প্রস্তাব দেন। পরে তিনি তার স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। সঙ্গে আনেন পুলিশ বডিগার্ডও। শোরুম মালিককে কাগজপত্র দেখিয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে স্ত্রী সই-সিলের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে চলে যান।

 

তবে বিপত্তি বাধে তিন মাস পর। ওই দম্পতির কাছ থেকে কেনা গাড়িটি দেখে নিজের দাবি করেন চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি। জানান, গাড়িটি ভাড়া নিয়ে শোরুমে বিক্রি করে দিয়েছেন প্রতারক দম্পতি।

 

শো-রুমের মালিক বলেন, ‘প্রতারকরা বলেছিল সে মিডিয়াতে কাজ করে; ইটিএন টিভি এরকম একটা নাম বলেছিল। আর মূল প্রতারক সাইফুল নিজেকে আনন্দ টিভির সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। সঙ্গে যে ভদ্রমহিলা এসেছিল, তাকে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। একটি গাড়ির সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত লেখা, একদম ম্যাজিস্ট্রেটের মতো, দুইটি গাড়ি নিয়ে এসেছিল। আমরা দেখেই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম এবং মনে হয়েছিল, সত্যিই ম্যাজিস্ট্রেট এসেছে, তাই কোনো সন্দেহ হয়নি।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেকের মাধ্যমে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি, বাকি টাকা নগদ দিয়েছিলাম ওইদিন। এইভাবে তাদের কাছে সম্পূর্ণ পেমেন্ট করেছি। কিন্তু আমরা জানতাম না যে তারা প্রতারক চক্র। পরে চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি জানায় তার গাড়িটা প্রতারকরা ভাড়া করে এনেছে। ভাড়া নিয়ে আবার আমাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। তখন আমি ক্যান্টনমেন্ট থানায় জিডি করি।’

 

ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা হলে আত্মগোপনে চলে যান স্বামী-স্ত্রী। গ্রেফতার এড়াতে বাসায় সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেন তারা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। দুই বছর পর সম্প্রতি কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন প্রতারক সাইফুল ইসলাম। আদালত থেকে আগেই জামিন নেয়ায় ধরা যায়নি রাজিয়া সুলতানাকে।

 

আরও পড়ুন: ভিক্ষুকদের সিম দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা, হাতিয়ে নিত লাখ লাখ টাকা

 

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, প্রতারক তার কেরানীগঞ্জের বাসার আশেপাশে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছিল। এজন্য আমাদের টিম অনেকবার চেষ্টা করেও তাকে ধরতে পারেনি। সোর্স বা তথ্য থাকত যে সে আশেপাশে আছে, কিন্তু রেইড দিলে দেখা যেত, সে সেখানে নেই। কারণ সে আগে থেকেই টের পেয়ে যেত যে পুলিশ আসছে, তাই সরে যেত।

 

সিআইডি বলছে, ২০১৮ সাল থেকে প্রতারণায় জড়িত সাইফুল-রাজিয়া। চাকরি দেয়ার নামে নিজ জেলা লক্ষ্মীপুর থেকে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে আসেন ঢাকায়। এছাড়া, তাদের বিরুদ্ধে এলাকা থেকে স্বর্ণ কিনে টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগও রয়েছে।

 

জসীম উদ্দিন খান আরও বলেন, সাইফুল স্ত্রীকে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দেয় এবং তার সঙ্গে একজন সাধারণ পুলিশ গানম্যান হিসেবে রাখে। আশেপাশে কিছু লোকও থাকে, যাদের কথাবার্তা বলে পরিচয় দেয়া হয়। ধরনটা এমনই থাকে যে স্ত্রী একজন ম্যাজিস্ট্রেট আর মূল প্রতারক নিজেকে কোনো কোম্পানির এমডি বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। এভাবেই তারা ভিক্টিমকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করে।

 

তবে ঢাকায় এসে প্রতারণার ধরন পাল্টান স্বামী-স্ত্রী। টার্গেট করেন- রেন্ট এ কার ও গাড়ির শোরুম। ভাড়া বা টেস্ট ড্রাইভিংয়ের নামে গাড়ি নিয়ে বিক্রি করে দেন তারা। এভাবে গত ৩ বছরে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। জসীম উদ্দিন খান বলেন, মালিকানাসংক্রান্ত বা মালিকানা হস্তান্তরের নামে তারা ফেইক ডকুমেন্ট তৈরি করে ক্রেতাকে বোঝানোর চেষ্টা করত যে গাড়িটি আসলে তাদেরই। কিন্তু বাস্তবে সেই ডকুমেন্ট সম্পূর্ণ ভুয়া।

 

এ পর্যন্ত এই দম্পতির নামে ৬টি মামলার তথ্য সিআইডির কাছে আছে, যার মধ্যে তিনটি জিআর মামলা এবং তিনটি সিআর মামলা।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন