সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদেও কড়াকড়ি আরোপ হলো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তো দূরের কথা, জুমার নামাজেও নির্দিষ্ট সংখ্যক মুসল্লি ছাড়া কারো অংশগ্রহণের সুযোগ থাকল না।
কিন্তু নামাজ তো থেমে থাকতে পারে না। ঠিক সেই সময়েই এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত, ছাদ থেকে উঠান পর্যন্ত—স্থানে স্থানে গড়ে উঠতে লাগল ছোট ছোট নামাজের জায়গা। ঢাকার বাড়ির ছাদে যেমন নামাজের স্থান নির্ধারিত হলো, তেমনি অজপাড়াগাঁয়ও ঈমানি তাগিদে নতুন নতুন জামাতের সূচনা হতে থাকল।
আমাদের এলাকাও এর বাইরে ছিল না। শহরের চাকরিজীবীরা তখন গ্রামে অবস্থান করছিলেন। বাড়ির কাছেই নামাজ পড়ার সুযোগ থাকায় সবার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ ও আগ্রহ তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বাড়িতেও অস্থায়ী মসজিদের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলো। ভাইয়েরা নামাজের জায়গা খুঁজতে লাগলেন।
আরও পড়ুন: বুখারির পর এবার মুসলিম শরিফ মুখস্থ করলেন অনন্য মেধার অধিকারী হাফেজ মাসউদ
ঠিক তখনই এগিয়ে এলেন আমাদের বোন রানু আপা। তিনি নিজের উঠান পরিষ্কার করলেন। নতুন মাটি দিয়ে লেপে নামাজের উপযোগী করে তুললেন। সেখান থেকেই শুরু হলো জামাতে নামাজ। পরে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকলে আরও বড় জায়গার প্রয়োজন দেখা দিল।
তখন আব্দুল হাই কাকা তার বাড়ির সামনের অংশে অস্থায়ী মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দিলেন। শুরু হলো নির্মাণকাজ। আমরা ভাইয়েরা সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে নেমে পড়লাম। মাটির ফ্লোর, পাশে ও উপরে টিন দিয়ে গড়ে উঠল ছোট্ট একটি মসজিদ।
আমার ইমামতিতে প্রথম জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মসজিদটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বাড়ির মুরব্বিরা ভীষণ খুশি হন। সময় পেলেই এসে নামাজ আদায় করেন। ধীরে ধীরে এমন কিছু নতুন নামাজি তৈরি হলো, যা দেখে আমরা আনন্দিত হলাম এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
পরে ভাইদের সম্মিলিত উদ্যোগে নামমাত্র বেতনে মাদরাসা পড়ুয়া ছোট ভাই মামুনকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিনা বেতনে আন্তাজ আলী ফুফা মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তাঁদের দু’জনের আন্তরিক চেষ্টায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাত নিয়মিত চলতে থাকে।
সময় বদলায়। করোনার প্রকোপ কমে আসে। চারপাশের অস্থায়ী মসজিদগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। আমাদের পাশের এলাকাতেও অনেক মসজিদ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা ভাইয়েরা তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যেভাবেই হোক এই মসজিদ টিকিয়ে রাখব।
প্রত্যেকে সাধ্যমতো মাসিক অনুদান নির্ধারণ করে মসজিদের কার্যক্রম চালু রাখা হলো। তবু অস্থায়ী জায়গায় আর কতদিন। প্রয়োজন দেখা দিল একটি স্থায়ী স্থানের, এমন জায়গার যেখানে সবাই নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করতে পারবেন।
কথা ছড়াতে ছড়াতে পৌঁছে গেল বোন জামাই সাইদুল ভাইয়ের কাছে। তিনি নিঃসংকোচে বললেন, মসজিদের জন্য তিনি জমি দেবেন। এক ঈদের পর বসলো মিটিং। তিনি নির্ধারিত স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি ওয়াকফ করে দিলেন। পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও দিলেন।
তবু বাস্তবতা সহজ ছিল না। অর্থাভাবে অনেক দিন জমিটি ফাঁকাই পড়ে রইল। পুরোনো অস্থায়ী মসজিদটিও নড়বড়ে হয়ে উঠল। সবকিছু মিলিয়ে নতুন জায়গায় মসজিদ নির্মাণ শুরু করা অনিবার্য হয়ে পড়ল।
মনির ভাইয়ের জমি থেকে মাটি এনে জায়গাটি ভরাট করা হলো। বাড়ির মুরব্বী, ভাইবন্ধু এবং মা, চাচি ও জেঠিদের অল্প অল্প দান আমাদের সাহস জুগিয়েছে। বহু অপেক্ষা, দুআ ও ত্যাগের পর অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেল।
আজ আমাদের বাড়ির মুরব্বীদের উপস্থিতিতে এবং এলাকার সম্মানিত আলেম মাওলানা অলিউল্লাহ হাফি., মাওলানা আব্দুল বারী হাফি., মাওলানা আব্দুল কাদির হাফি. ও হাফেজ হাবিবুর রহমান হাফি.গণের মাধ্যমে নতুন মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হলো।
করোনার সময় গড়ে ওঠা অস্থায়ী মসজিদটি আজ স্থায়ী মসজিদে রূপ নিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। এটি শুধু একটি মসজিদের গল্প নয়। এটি বিশ্বাসের গল্প। এটি একতার গল্প। এটি আল্লাহর ঘর তৈরির জন্য কিছু সাধারণ মানুষের অসাধারণ অঙ্গীকারের গল্প।
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলূম, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
]]>
৪ সপ্তাহ আগে
৬








Bengali (BD) ·
English (US) ·