সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, স্কোয়াডের ভারসাম্য এবং কোচিং দর্শন; সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান তুরস্ক এখন এক ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ইতালিয়ান কোচ ভিনসেনজো মন্টেলা। ২০২৩ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দলটিকে ‘তারকা নির্ভরতা’ থেকে বের করে একটি সুসংগঠিত ইউনিটে পরিণত করেছেন। ইতালিয়ান কোচদের মতোই তার প্রথম লক্ষ্য ছিল রক্ষণভাগ গুছিয়ে তোলা, এরপর ধীরে ধীরে আক্রমণে গতি যোগ করা। ফলাফলও মিলেছে, গত আড়াই বছরে তুরস্কের জয়ের হার প্রায় ৬০ শতাংশ, পরাজয়ের হার ২৫ শতাংশ, আর গোল হজমের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রক্ষণভাগে স্থিরতা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ
তুরস্কের বর্তমান শক্তির বড় ভিত্তি তাদের রক্ষণভাগ। মেরিহ দেমিরাল, আব্দুলকেরিম বারদাকসি ও কাগলার সোয়উনকুর এর মতো সেন্টার-ব্যাকরা শারীরিক দৃঢ়তা ও পজিশনিংয়ে দলকে স্থিতিশীলতা দিয়েছেন। ফুল-ব্যাক হিসেবে জেকি সেলিক ডিফেন্স ও আক্রমণের মধ্যে ভারসাম্য রাখেন।
তবে তুরস্কের আসল শক্তি মাঝমাঠ। হাকান কালহানোগলুর অভিজ্ঞতা, আর্দা গুলারের সৃজনশীলতা এবং ওর্কান ককসুর কর্মক্ষমতা মিলিয়ে এই লাইনআপ দলকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়। বল দখল, থ্রু পাস কিংবা দূরপাল্লার শটে তারা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে।
আক্রমণে সম্ভাবনা, কিন্তু প্রশ্নও আছে
ফরোয়ার্ড লাইনে প্রতিভা থাকলেও এখনো ধারাবাহিক গোলদাতার অভাব স্পষ্ট। কেনান ইলদিজ ও বারিস আলপার ইলমাজ গতি ও ড্রিবলিংয়ে এগিয়ে থাকলেও ফিনিশিংয়ে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। অভিজ্ঞ সেঙ্ক তসুন থাকলেও তিনি আর আগের মতো ধারাবাহিক নন। ফলে বড় ম্যাচে সুযোগ কাজে লাগানোই তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিসংখ্যান যা বলছে
গত ৩–৪ বছরে তুরস্ক প্রায় ৪০টির বেশি ম্যাচ খেলে ২০টির বেশি জয় পেয়েছে। মন্টেলার অধীনে এই পারফরম্যান্স আরও উন্নত হয়েছে—কম ম্যাচ হেরেছে, গোল হজমও কমিয়েছে। বড় জয়গুলোর মধ্যে বুলগেরিয়াকে ৬-১, জার্মানিকে ৩–২ ও ক্রোয়েশিয়াকে ১–০ ব্যবধানে হারানো উল্লেখযোগ্য। আবার অস্ট্রিয়ার কাছে ১–৬ গোলের বড় হার কিংবা পর্তুগালের বিপক্ষে ব্যর্থতা দেখিয়েছে তাদের সীমাবদ্ধতাও।
তবে ইউরো ২০২৪-এ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা এবং বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন, এই দুটি অর্জন প্রমাণ করে দলটি এখন ধারাবাহিকভাবে উন্নতির পথে।
আরও পড়ুন: কসোভোকে হারিয়ে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে তুরস্ক
কোচ মন্টেলার কৌশল
মন্টেলার সবচেয়ে বড় অবদান হলো দলকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা। ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলিয়ে তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলান। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলেছেন। তার অধীনে তুরস্ক এখন প্রতিপক্ষ অনুযায়ী খেলার ধরণ বদলাতে পারে, যা বড় টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ।
কতটা শক্তিশালী তুরস্ক?
সব দিক বিবেচনায় তুরস্ক এখন ‘ডার্ক হর্স’। তারা হয়তো শিরোপার দাবিদার নয়, কিন্তু যেকোনো বড় দলকে চাপে ফেলতে পারে। রক্ষণভাগের দৃঢ়তা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা; এই তিনটি দিক তাদের বড় শক্তি।
তবে আক্রমণে ধারাবাহিকতা না এলে বড় সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে। বিশ্বকাপে তাদের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি সেটিকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে তার ওপর।
গ্রুপ বিশ্লেষণ: তুরস্কের কঠিন পথ
২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘ডি’-তে তুরস্ক পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের সঙ্গে। প্রতিটি প্রতিপক্ষই আলাদা ধাঁচের এবং নিজেদের দিনে বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্র তরুণ ও দ্রুতগতির ফুটবল খেলে, অস্ট্রেলিয়া শারীরিক ও রক্ষণাত্মকভাবে শক্তিশালী, আর প্যারাগুয়ে কমপ্যাক্ট ডিফেন্সে দক্ষ ও কৌশলী কাউন্টার অ্যাটাকে ভয়ংকর।
তুরস্কের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে—মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আক্রমণে ধারাবাহিকতা রাখা। তবে নতুন ফরম্যাটে ৪৮ দলের মধ্যে ৩২ দল নকআউটে উঠবে, তাই এক বা দুটি জয় এবং গোল ব্যবধানের মাধ্যমে নকআউটের সুযোগ রয়েছে। সঠিক কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তা বজায় থাকলে তুরস্ক এই কঠিন গ্রুপ পেরিয়ে বড় চমক দেখাতে পারে।
আরও পড়ুন: ‘আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ’—ইসলামবিদ্বেষী স্লোগানে ইয়ামালের প্রতিবাদ
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন প্রজন্ম, নতুন কোচ এবং নতুন দর্শনের তুরস্ক এবার বিশ্বকাপে শুধু অংশগ্রহণ করতেই আসেনি, ২০০২ আসরের পুনরাবৃত্তি কিংবা নতুন কোনো ইতিহাস গড়ে ফেলতে পারে তারা।

১ সপ্তাহে আগে
৩








Bengali (BD) ·
English (US) ·