ধোনির বায়োপিক যেভাবে বদলে ফিয়েছিল উসমান তারিকের জীবন

৩ সপ্তাহ আগে
গত ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছিল উসমান তারিককে নিয়ে। বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে পাকিস্তান জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকেই বোলিং অ্যাকশনের জন্য আলোচনায় এই স্পিনার। অথচ ২৮ বছর বয়সী তারিক এক যুগ আগেই ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে পারেননি তিনি। একটি সিনেমাই নাকি তারিককে ফিরিয়ে এনেছিল ক্রিকেটের কাছে।

২০১৫ সালে চালো চাকরির খোঁজে পাকিস্তান ছেড়ে দুবাই চলে যান উসমান তারিক। মাত্র ৪ বছর বয়সে বাবকে হারানো তারিকই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই তিনি ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। খাইবার পাখতুনখোয়ার নওশেরার এই লম্বা ও শক্তপোক্ত ক্রিকেটার তখন সিম ও স্পিন—দুই ধরনের বোলিংই করতেন। দুবাইয়ে গিয়ে শুরুতে বিভিন্ন অস্থায়ী চাকরি করার পর একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে পারচেজ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে স্থায়ী কাজ পান।


তারিকের জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়া ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালে। সে বছরের শেষ দিকে তিনি দেখেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র (বায়োপিক)–এমএস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি। প্রায় ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা তারিক ধোনির গল্পে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। বিশেষ করে ধোনি যে ক্রিকেটে পুরোপুরি মন দেওয়ার আগে ভারতীয় রেলওয়েতে টিকিট পরীক্ষক হিসেবে কাজ করতেন—এই বিষয়টি তারিককে নাড়া দেয়।


ধোনির বায়োপিক তারিককে এতোটাই নাড়া দেয় যে তিনি আবারও কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতা নিয়ে ক্রিকেটে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তেরই ফল—২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের হয়ে খেলছেন তিনি।

 

আরও পড়ুন: সুপার এইটে কে কোন গ্রুপে, খেলা শুরু কবে


মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) কলম্বোতে তারিক বলেন, 'এমএস ধোনির সিনেমা দেখেই আমি ক্রিকেটে ফিরেছি। সিনেমাটা দেখার পর মনে হয়েছে, আমাদের গল্প যেন এক। আমি চাকরি করছিলাম, সেও করছিল (ক্রিকেটে পুরোপুরি মন দেওয়ার আগে)। সে ইতিহাস গড়েছে। আমি সাধারণ মানুষ, আমিও হয়তো একই পথ অনুসরণ করতে পারি—তবে তার জন্য অনেক কঠোর পরিশ্রম দরকার। আমি শুধু এমএস ধোনির কারণেই ক্রিকেটে ফিরেছি।'


পরিশ্রম বৃথা যায়নি। গত কয়েক বছরে সিপিএল, পিএসএল ও আইএলটি২০সহ বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে সফল ট্রায়াল দেওয়ার পর, গত জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে পাকিস্তানের হয়ে অভিষেক হয় তারিকের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তিন উইকেট নিয়ে দারুণ সূচনা করেন তিনি। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচের আগে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।


 

ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত


এর মধ্যে মুদ্রার অপর পিঠও দেখেছেন এই ২৮ বছর বয়সী। অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তা আরও তীব্র হয়, ভক্ত, গণমাধ্যম এমনকি সাবেক ক্রিকেটাররাও তার অ্যাকশন, থামার ভঙ্গি ও বৈচিত্র্য নিয়ে মত দেন। তবে তারিক শান্ত ছিলেন।


নামিবিয়া ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার কাছে 'প্রক্রিয়া'টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার বোলিং নিয়ে এত আলোচনা হওয়ায় তিনি আনন্দিতও। এমনকি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রাও তার অ্যাকশন নকল করার চেষ্টা করেছেন, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আগের দিন সূর্যকুমার যাদবকেও তা করতে দেখা যায়।


তারিক বলেন, 'প্রতিপক্ষ দল যদি আমাকে সামলানোর জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেয়, সেটা আমার জন্য ভালো লক্ষণ। এতে আমি আরও আত্মবিশ্বাস পাই। আমি প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছি।'


প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে প্রায় ৯০ শতাংশ দর্শকই ছিল ভারতীয় সমর্থক, কিন্তু তারিক এমন শান্তভাব দেখান যা হয়তো তার দলের অভিজ্ঞ তিন বোলার শাহিন আফ্রিদি, শাদাব খান ও আবরার  আহমেদও অস্বস্তিতে পরে গিয়েছিলেন। ভারতীয় ব্যাটারদের সামনে তারা যখন অসহায় পরে পড়েছিলেন, তখনও তারিক পাকিস্তানকে ম্যাচে রাখার চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় ওভারে ১০ রান দেওয়া ছাড়া অন্য ওভারগুলোতে তিনি দেন ৬, ৪ ও ৫ রান। ইনিংসের শেষের আগের ওভারে তিনি সূর্যকুমারকে আউট করেন। 


তারিক তার সিগনেচার ভঙ্গিতে উদযাপন করেন, যাতে ছিল সম্মান ও সৌজন্যের ছাপ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তার পরিসংখ্যান ছিল–৪-০-২৫-১; যা যথেষ্ট ভালো।  

 

আরও পড়ুন: আজ পাকিস্তানের বিশ্বকাপে টিকে থাকার লড়াই


তবে তারিক মনে করেন, আবার এমন ম্যাচ খেললে তিনি ভিন্নভাবে খেলবেন। তার ভাষায়, 'পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ দুই দেশ এবং পুরো বিশ্ব দেখে। সত্যি বলতে, আমি এই ম্যাচটিকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলাম—নিজের নাম করার সুযোগ। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, আমি মানদণ্ডে পুরোপুরি উঠতে পারিনি। আবার এমন ম্যাচ খেলতে পারলে আগের চেয়ে অনেক ভালো করতে চাই।'


তিনি  আরও বলেন, 'ভারতীয় ব্যাটাররা আমাকে যেভাবে খেলেছে, তারা খুব মনোযোগী ছিল। তারা উইকেট দিতে চায়নি। আমি নিজের পরিকল্পনায় অটল ছিলাম, উইকেট নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি নিরাপদ দিকেই ছিলাম—উইকেট না পেলেও বেশি রান দিইনি। ডেথ ওভারে কম রান দেওয়া দলের জন্য বড় সুবিধা। আমার জন্যও সেটি ইতিবাচক ছিল।'


ধোনির বায়োপিক দেখার পর ক্রিকেটে ফেরার পেছনে আরেকটি অনুভূতি কাজ করেছিল—খ্যাতি পাওয়ার ইচ্ছা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তারিকের ক্যারিয়ার মোটে পাঁচ ম্যাচের পুরোনো। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্ব ইতিমধ্যেই জানে—উসমান তারিক কে!

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন