ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণুতা শেখার মাস রমজান

১ সপ্তাহে আগে
মহিমান্বিত মাস রমজান। ধৈর্যধারণের মাস। কষ্টসহিষ্ণুতা শেখায়। মানুষের কথাবার্তায়, কাজেকর্মে ও চলাফেরায় ধৈর্যধারণের মাধ্যমেই সিয়াম সাধনা পরিপূর্ণ হয়। রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করে সব ধরনের পাপকাজ, পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকেন।

এটি সমবেদনা প্রকাশের মাস। এ মাসে মুমিন বান্দাদের রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের কঠোর ত্যাগ, উদারতা, সততা, ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। ধৈর্যধারণের বিনিময়ে নির্ধারিত রয়েছে অতুলনীয় শান্তির আবাস বেহেশত। তাই এ মহান মাসটির পরিচয় তুলে ধরে ধৈর্য-সংযমের গুরুত্ব প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এটা সবর বা ধৈর্যের মাস, আর সবরের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।’ (মিশকাত)


যথাযথভাবে রোজা পালনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমত লাভ করা যায়। রোজা রাখলে ব্যক্তির চরিত্র বিধ্বংসী কুপ্রবৃত্তি দমন হয়। ব্যক্তির চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা ও লজ্জাস্থানসহ সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অতিরিক্ত চাহিদা অবদমিত হয়। রোজার মাধ্যমে ব্যক্তি কুপ্রবৃত্তি ও প্রলোভনের ওপর জয়ী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়। অন্তরের যাবতীয় মলিনতা ও কুটিলতা দূর হয়। রোজা মানুষকে যাবতীয় অবাঞ্ছিত কাজ থেকে বিরত থাকতে অভ্যস্ত করে তোলে। ক্ষুধার অনুভূতি ধনীর অন্তরে দরিদ্রের জন্য সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে। দরিদ্রকে সাহায্য করার মানসিকতা সৃষ্টি করে।

 

আরও পড়ুন: এ বছর শবে কদর যে তারিখগুলোতে হতে পারে

 

হজরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের আশায় রোজা পালন করে, তার পূর্বাপর গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ রোজা বিশ্ব মুসলিম সমাজে সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে। এ মাসে আত্মশুদ্ধিসহ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও নম্র স্বভাবের গুণে গুণান্বিত হওয়া যায়। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে- ‘জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, তন্মধ্যে একটি দরজার নাম হচ্ছে ‘রাইয়্যান’। 

 

এটি দিয়ে একমাত্র রোজাদাররাই প্রবেশ করবেন। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও রোজার উপকারিতা রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন- নিয়ম মেনে রোজ পালন করলে রোজা বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস ও শারীরিক সুস্থতা আনয়ন করে। একইসঙ্গে মানসিক প্রশান্তি লাভের অন্যতম মাধ্যম এই রোজা। রোজাই মানুষকে আল্লাহ ও বান্দার অধিকার আদায়ে যোগ্য করে তোলে।


আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কুপ্রবৃত্তি মানুষকে ইবাদত করা থেকে সর্বদা বিরত রাখতে চেষ্টা করে। সুতরাং সহনশীলতার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তিগুলোকে দমন করে আল্লাহর ইবাদত সম্পন্ন করা উচিত। নতুবা মানবজীবনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। 

 

তাই ধৈর্য ধারণ করে মৌলিক ইবাদত করতে হবে আর এরই নাম ইবাদতে সবর। নামাজ প্রতিষ্ঠায়, রোজা পালনে ও হজ আদায় করতে যথেষ্ট ধৈর্য ধারণ করতে হয়। ফরজ, সুন্নত, নফল, জুমা, তারাবি, তাহাজ্জুদসহ বিভিন্ন নামাজে ধৈর্যের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। রমজান মাসে সারা দিন পানাহার পরিত্যাগ করে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে রোজা রাখতে হয়। এমনিভাবে প্রচুর অর্থসম্পদ ব্যয় করে, শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করে এবং যথেষ্ট সময় ব্যয় করে হজ সম্পাদন করতে হয়।


 

মাহে রমজান ধৈর্যের মাস। সারা দিন পানাহার বর্জন করে রোজা রাখতে কষ্ট হবেই; বিশেষত গরমের দিনে সেই কষ্ট আরও অধিক অনুভূত হয়। আল্লাহ তাআলার অগাধ ভালোবাসা ও সওয়াব লাভের আশায় অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সেই কষ্ট সহ্য করতে হয়। মসজিদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে খতমে তারাবি নামাজ আদায় করতে হয়। 

 

এ ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ধৈর্যের প্রয়োজন রয়েছে। হাফেজ সাহেব ধীরস্থিরভাবে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করলে একটু অধিক সময় লাগে এবং দণ্ডায়মান থাকতে বেশি কষ্ট হয়। কিন্তু সওয়াবের আশায় এ কষ্টও রোজাদারদের সহ্য করতে হয়। 

 

বস্তুত কষ্টের অনুপাতেই সওয়াব নির্ণীত হয়। দ্বীনের কাজে কষ্ট যত বেশি হবে, সওয়াবও তত বেশি হবে। এ মাসে জীবনের সর্বক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান পালনসহ ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। অনেকের মেজাজ কড়া থাকায় ধৈর্যচ্যুত হয়ে সামান্য কারণেই অন্যের সঙ্গে বাদানুবাদ ও ঝগড়া-বিবাদে তারা লিপ্ত হয়। এটা সম্পূর্ণ অনুচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রোজার দিনে কেউ যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং শোরগোল না করে। তার সঙ্গে কেউ ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে সে যেন (অধৈর্য না হয়ে) বলে, ‘আমি রোজাদার।’ (বুখারি)

 

ইমান ও সৎ কর্ম চালু রাখা এবং সত্য-ন্যায়ের সংরক্ষণ ব্যক্তি ও সমাজের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। এ কঠিন কাজ সম্পাদনের জন্য যে ধৈর্য ও সহনশীলতা বা সবরের প্রয়োজন, তা মাহে রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। আর এ সবর জান্নাতের পথ সুগম করে। যারা মাহে রমজানে সবর করেন, আল্লাহ তাআলা তাদের বেহেশত দান করবেন। হাদিস শরিফে রোজাকে ‘শরীরে জাকাত’ আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে ‘রোজা ধৈর্যের অর্ধেক এবং ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত। 

 

আরও পড়ুন: ফরজ গোসলের আগে কি সেহরি খাওয়া জায়েজ?

 

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

 

ধৈর্য জান্নাতের ভান্ডারসমূহের একটি ভান্ডার।’মাহে রমজানে কঠোরভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ধৈর্য ও সহনশীলতার যে মানবিক গুণটি অর্জিত হয়, তা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের গুণই নয়, বরং এ মহৎ গুণটি কারও মধ্যে সৃষ্টি হলে ইমানদারের সমষ্টিগত জীবনে অপরের জন্য তা উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে, মানুষকে কঠিন ও দুর্গম পথ পরিক্রমায় চলতে শক্তি জোগায়। রোজা পালনের মাধ্যমে অর্জিত ধৈর্য ও সহনশীলতা ইমান ও তার ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সাধনায় প্রচুর নিয়ামক শক্তি সঞ্চার করে। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত সহনশীলতা তাই শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণই নয়, বরং মুসলমান সমাজের জন্য একটি দলগত কল্যাণ বয়ে আনে। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘অবশ্যই ধৈর্যশীলদের তাদের (ধৈর্যের) প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে প্রদান করা হবে।’ (সূরা আল-জুুমার, আয়াত-১০)

 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন