ঢাকার ২১ সাংবাদিক পেলেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের প্রশিক্ষণ

১ সপ্তাহে আগে
তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের এই যুগে সাংবাদিকতা এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে সামাজিকমাধ্যমে ভুল তথ্যের দ্রুত বিস্তার, অন্যদিকে সাংবাদিকদের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ও আইনি ঝুঁকি- এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও সচেতন সংবাদকর্মী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন আয়োজন করেছিল তিন দিনব্যাপী এক বিশেষ প্রশিক্ষণ ও মেন্টরিং কর্মসূচি।

রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে, 'জনস্বার্থে বলি, নির্ভয়ে নিরাপদে' শিরোনামের এই কর্মসূচিতে ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যমের ২১ জন সক্রিয় সাংবাদিক অংশ নেন। ইউরোপীয় কমিশনের সহায়তায় পরিচালিত FREED (Freedom of Expression for Effective Democracy in Bangladesh) প্রকল্পের আওতায় গত ১৭ থেকে ১৯ এপ্রিল টানা তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয় প্রশিক্ষণটি।


প্রশিক্ষণ কর্মশালা অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানসূত্র জানিয়েছে, প্রশিক্ষণটি শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বর্তমান বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবেশের বাস্তব চিত্র সামনে রেখে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে পুরো কর্মসূচিটি পরিকল্পনা করা হয়।


প্রথমত, ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি ও বাংলাদেশের তথ্য বিশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ বিষয়ক সেশনে আলোচনা হয় কীভাবে সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে গুজব ও অর্ধসত্য তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং একজন সাংবাদিক কীভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি কীভাবে একজন সাংবাদিক বিষয়টিতে সাধারণ মানুষকে তার রিপোর্টের মাধ্যমে সচেতন করতে পারেন।


দ্বিতীয়ত, ফ্যাক্টচেকিং ও ভেরিফিকেশন ফার্স্ট জার্নালিজম বিষয়ক সেশনে তুলে ধরা হয় প্রকাশের আগেই তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব এবং এ সংক্রান্ত আধুনিক ডিজিটাল টুলস ও পদ্ধতিগুলো। প্রতিটি তথ্য প্রকাশের আগে সেটি যাচাই করা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, এটি পাঠক ও দর্শকের প্রতি নৈতিক অঙ্গীকারও বলে জোর দেন প্রশিক্ষক। একজন সাংবাদিক ছবি/ভিডিও ছাড়াও সরকারের কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দাবিগুলো কীভাবে ভেরিফাই করতে পারেন, জিও লোকেশন ট্রাকিংয়ের চ্যালেঞ্জ কী এবং সামরিক বিমান ট্রাকিং করার সহজতম পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করা হয় কর্মশালায়।


তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল ও ইনক্লুসিভ সাংবাদিকতা বিষয়ক আলোচনায় উঠে আসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর, সংখ্যালঘু, নারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে কীভাবে সংবাদকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়।


চতুর্থত, জনস্বার্থমূলক প্রতিবেদন তৈরি বিষয়ক সেশনে শেখানো হয় কোন বিষয়গুলো প্রকৃতপক্ষে জনগণের জানার অধিকারের আওতায় পড়ে এবং সেই বিষয়গুলো নিয়ে কীভাবে সাহসী ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব।


এছাড়াও, নাগরিক অধিকার নিশ্চিতে সাংবাদিকদের দায়িত্ব শীর্ষক পর্বে আলোচনা হয় গণতান্ত্রিক সমাজে মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সাংবাদিকরা কীভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ও নাগরিকের পক্ষে সরব ভূমিকা রাখতে পারেন।


প্রশিক্ষণের একটি বিশেষভাবে আলোচিত পর্ব ছিল বিবিসি ভেরিফাই-এর সঙ্গে সরাসরি কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ডিজিটাল ভেরিফিকেশনের ব্যবহারিক দিক তুলে ধরা।


ট্রেইনার ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার কামাল হোসেন শাহরিয়ার এ বিষয়ে বলেন, ভেরিফিকেশন কেবল ফ্যাক্টচেকিং ডেস্কের কাজ নয়, এটি প্রতিটি সাংবাদিকের দৈনন্দিন চর্চার অংশ হওয়া উচিত।


শুধু ব্রেকিং নিউজ নয়, রুটিন প্রতিবেদনেও ছবি-ভিডিও যাচাই, জিওলোকেশন, টাইমস্ট্যাম্প ও তথ্যের উৎস যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি উল্লেখ করেন।


প্রশিক্ষণের উল্লেখযোগ্য আরেকটি অংশ ছিল সাংবাদিকদের আইনি নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ সেশন। এটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর লিগ্যাল স্পেশালিস্ট মণিষা বিশ্বাস। এই সেশনে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনি বিধানের অধীনে সাংবাদিকদের অধিকার ও করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নিজেরা যেসব আইনি প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন, সেই অভিজ্ঞতাগুলোও এই পর্বে তুলে ধরেন।


প্রশিক্ষক দলে ছিলেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার কামাল হোসেন শাহরিয়ার ও সোহানা পারভীন, সিনিয়র ডেভেলপমেন্ট অফিসার নূর সিদ্দিকী ও আরফাত আলী এবং মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার রাশেদুল হাসান।


প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা জানান, এই কর্মসূচি তাদের পেশাগত জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কীভাবে জনস্বার্থে সাহসী প্রতিবেদন তৈরি করা যায়, একইসঙ্গে নিজের ডিজিটাল ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা যায়- এই দুটি বিষয়ে তারা একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন বলে জানান। ভবিষ্যতে এই জ্ঞান ও দক্ষতা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করে আরও মানসম্মত, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রভাবশালী সংবাদ পরিবেশন সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


প্রশিক্ষণ শেষে সাংবাদিকরা আইনি নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাই বিষয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজনের অনুরোধ জানান।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন