খাদ্যে সহায়তা কমায় রোহিঙ্গাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

১ সপ্তাহে আগে
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে নতুন পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাসিক খাদ্য সহায়তা বিতরণ শুরু হয়েছে।

বুধবার (১ এপ্রিল) সকাল থেকে ক্যাম্পগুলোতে পরিবারভেদে ৩ ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আগের ১২ ডলারের পরিবর্তে এখন থেকে পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলারে সহায়তা পাচ্ছে। এতে ক্যাম্পজুড়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, এতে খাদ্যসংকট, অপুষ্টি ও নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।


উখিয়ার ৩ নম্বর ক্যাম্পের এফ ৪ ব্লকের বাসিন্দা রমজান আলী ও লাল মতি।  তারা মিয়ানমারের মংডুর নাপিতের ডেইল এলাকার বাসিন্দা। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১২ জন। কিন্তু খাদ্য সহায়তায় ক্যাটাগরিভিত্তিক পরিবর্তন আসায় চরম দুশ্চিন্তায় তারা। যেখানে আগে ১২ ডলারে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতেন, এখন ৭ ডলারে কীভাবে চলবে কপালে চিন্তার ভাঁজ।


রমজান আলী (৬৩) বলেন, পরিবারের সদস্য সংখ্যা এখন ১২ জন। তিনি চান, খাদ্যসহায়তা সব রোহিঙ্গার জন্য সমানভাবে দেওয়া হোক, যেন কেউ কম বা বেশি না পায়।


তিনি বলেন, একেকজনকে ভিন্ন পরিমাণে ৭, ১০ ও ১২ ডলারে সহায়তা দেওয়া ঠিক নয়। ঘরে সদস্য বেশি হলেও আয় করার কেউ নেই, আবার ক্যাম্পের বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই সহায়তা কমিয়ে দিলে তাদের সংসার চালানো সম্ভব হবে না।


লাল মতি (৪৫) বলেন, ২০১৭ সালে তিনি কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা ১২ জন-স্বামী-স্ত্রীসহ ১০ জন ছেলে-মেয়ে। এত বড় পরিবার নিয়ে ৭ ডলারের খাদ্যসহায়তায় কোনোভাবেই চলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।


আরও পড়ুন: উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্র-গুলিসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার

তিনি বলেন, তাদের পরিবারের কেউই ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে আয় করতে পারে না। একবার তার ছেলে বাইরে কাজ করতে গেলে সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত হয় এবং তাকে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবার চালানো নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রমজান আলী ও লাল মতি দম্পতি নন; মাসিক খাদ্য সহায়তা নতুনভাবে নির্ধারণে এখন কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের প্রতিটি ক্যাম্পজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ। অনেকের ১২ ডলারের পরিবর্তে ৭ ডলার নির্ধারণ করায় ছুটে আসছেন ডব্লিউএফপি পরিচালিত আউটলেটগুলোতে। কিন্তু পাচ্ছেন না কোন সুরাহা।


ক্যাম্প ৩-এর বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুর (৬০) বলেন, খাদ্যসহায়তা ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলারে নামিয়ে আনার কারণ জানতে তিনি ডব্লিউএফপির আউটলেটে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে প্রশ্ন করেছেন। তবে তারা শুধু অভিযোগ দিতে বলেছেন, কিন্তু কোথায় বা কীভাবে অভিযোগ করতে হবে সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেননি।


তিনি আরও বলেন, তার পরিবারের একজন সদস্য ১৮ বছরের বেশি বয়সী হওয়ায় সহায়তা কমানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু ওই ছেলে কোনো কাজ করে না এবং ক্যাম্পের বাইরেও যেতে পারে না। তাই এই অবস্থায় সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় তারা কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।


আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তায় নতুন নীতিমালা, তিন ক্যাটাগরিতে হবে বিতরণ

ক্যাম্প ৩-এর বাসিন্দা আব্দু ছালাম (৫০) বলেন, খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের মতো বড় পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলেও সহায়তা কমে যাওয়ায় কীভাবে চলবেন, কী খাবেন-তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।


তিনি জানান, বর্তমানে ৭ ডলারের সহায়তায় মাস চালানো সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি অভিযোগ জানাতে ডব্লিউএফপি আউটলেটে এসেছেন বলে উল্লেখ করেন।


রোহিঙ্গার জন্য বুধবার (০১ এপ্রিল) থেকে মাসিক খাদ্য সহায়তা নতুনভাবে নির্ধারণ হয়েছে। বর্তমান ১২ ডলারের পরিবর্তে পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলারে ভাগ করে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বলছেন, খাদ্য সহায়তা কমানোর কারণে খাদ্যসংকট, অপুষ্টি, অপরাধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বাড়বে।


ক্যাম্প ৪ এ-৩ ব্লকের বাসিন্দা রায়জু (২০) বলেন, তাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা তিনজন। আগে মাসে ১২ ডলার সমমূল্যের খাদ্যসহায়তা পেতেন, কিন্তু এবার পেয়েছেন মাত্র ৭ ডলার। এই সহায়তায় তারা শুধু চাল ও একটি তেলের বোতল পেয়েছেন।


তিনি জানান, আগে ৩ লিটার তেল, ৩ কেজি চিনি, ৩ কেজি ডাল, ১ কেজি মরিচ, ৩ কেজি পেঁয়াজ, আধা কেজি রসুন এবং ৩৯ কেজি চাল দেওয়া হতো। অথচ এবার পেয়েছেন ১ লিটার তেল, ১ কেজি চিনি, অল্প পেঁয়াজ এবং ২৬ কেজি চাল। তাও একজনের ১৩ কেজি চাল বাদ দিয়ে অন্য বাজার করেছি।


রায়জু প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই সামান্য খাদ্য দিয়ে কীভাবে পুরো মাস চলবো? তার ওপর আমি সন্তানসম্ভবা।’


একই ক্যাম্পের বাসিন্দা ছেনুয়ারা বেগম (২২) বলেন, ‘আগে ১২ ডলারের খাদ্যসহায়তায় অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যেত। কিন্তু এখন সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক কিছুই বাইরে থেকে কিনতে হবে।’


তিনি জানান, এবার ৭ ডলারের সহায়তায় পেয়েছেন মাত্র ১ কেজি পেঁয়াজ, ১ লিটার তেল, ১ কেজি ময়দা এবং দুইজনের জন্য ২৬ কেজি চাল। ফলে ডালসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে এখন বাইরে নির্ভর করতে হবে বলে জানান তিনি।


ক্যাম্প-৪, বি-৩ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইদ্রিস (২৪) বলেন, তাদের সাত সদস্যের পরিবার আগে প্রতি মাসে ১২ ডলারের খাদ্যসহায়তা পেত, তখন অন্তত কিছুটা স্বস্তিতে থাকা যেত। কিন্তু বর্তমানে সহায়তা কমে ৭ ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে তারা পাচ্ছেন শুধু চাল ও একটি তেলের বোতল।


তিনি জানান, আগে মরিচ, লবণ, হলুদ, ডাল ও চিনি-সবই পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সেসব কিছুই দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে ৭ ডলারের সহায়তায় তারা মাত্র ১৩ কেজি চাল ও একটি তেলের বোতল পাচ্ছেন, যা দিয়ে পুরো মাস চালানো সম্ভব নয়।


ইদ্রিস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে খাদ্যসহায়তা কমে গেলে অনেকেই বেঁচে থাকার তাগিদে অপরাধের দিকে ঝুঁকতে পারে বা ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার চিন্তা করতে পারে। কিন্তু বাইরে যাওয়ারও সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।


ক্যাম্প ৪-বি, ৩ ব্লকের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম (৪৫) বলেন, তাদের পরিবারে পাঁচজন সদস্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেভাবে খাদ্যসহায়তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের জন্য জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে।


তিনি জানান, আগে ১২ ডলারের সহায়তায় কোনোভাবে ডাল-ভাত জোগাড় করা যেত। কিন্তু এখন ৭ ডলারের সীমিত সহায়তায় তা আর সম্ভব নয়। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে চুরি-ডাকাতি বা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।


তবে তহবিল কমে যাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত বলে জানায় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন।


শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা গোষ্ঠীর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের জন্য বড় আকারের ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। সে সময় যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান) বার্ষিক আকার ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই সহায়তায় ভাটা পড়েছে। ২০২৪ সালের পর থেকে তা আরও কমে যায় এবং ২০২৫ সালে প্রাপ্ত সহায়তা নেমে আসে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারে। চলতি বছরে কত অর্থায়ন পাওয়া যাবে তা এখনো নিশ্চিত নয়, যদিও প্রয়োজন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।


মো. মিজানুর রহমান বলেন, অর্থসংকটের কারণে সহায়তা প্রদানে ‘নিড-বেসড’ বা প্রয়োজনভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) পরিবারগুলোর অবস্থা বিবেচনায় তিনটি ক্যাটাগরিতে সহায়তা দিচ্ছে।


আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই স্থায়ী সমাধান: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী


প্রথমত, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে মাথাপিছু প্রতি মাসে ৭ ডলার করে দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ পাচ্ছে ১২ ডলার করে; এর মধ্যে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, শিশু-নেতৃত্বাধীন পরিবার বা বয়স্ক সদস্য থাকা পরিবারগুলো অতিরিক্ত ৩ ডলার সহায়তা পেতে পারে। তৃতীয়ত, বাকি ৫০ শতাংশ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে মাথাপিছু ১০ ডলার করে।


তিনি বলেন, যেসব পরিবারে কর্মক্ষম সদস্য রয়েছে-যারা বিভিন্ন সংস্থা বা এনজিওতে পেইড ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছে কিংবা ক্যাম্পে ছোটখাটো ব্যবসা করছে—তাদের তুলনামূলক কম সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।


মিজানুর রহমান আরও বলেন, ২০২৪ সালে হঠাৎ অর্থসংকট দেখা দিলে একপর্যায়ে সবার জন্য রেশন কমে ৬ ডলারে নেমে গিয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে আরও পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত।


তবে তিনি স্বীকার করেন, আগে যেখানে বেশি সহায়তা পাওয়া যেত, এখন তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।


তিনি জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন, এনজিও কর্মী এবং রোহিঙ্গা কমিউনিটির মাঝি ও ভলান্টিয়ারদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। গত এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে। এছাড়া ডব্লিউএফপির সঙ্গে সমন্বয় করে বৈঠক ও উপস্থাপনার মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানো হচ্ছে।


তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেই কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


এদিকে রেশন কমানোর প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) কক্সবাজারের টেকনাফের ২৪ নম্বর ক্যাম্পে মানববন্ধন করেন রোহিঙ্গারা।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন