খাগড়াছড়িতে চলছে নদী-খাল দখলের মহোৎসব

১ সপ্তাহে আগে
খাগড়াছড়িতে নদী, খাল ও ছড়া দখলের মহোৎসব চলছে। প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলের কারণে ক্রমশ সরু হয়ে যাচ্ছে শহরের ছোট-বড় প্রাকৃতিক নালাগুলো। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে শহরে ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, খাগড়াছড়ি শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খাগড়াছড়ি খাল, রাঙ্গাপানি ছড়া ও চেঙ্গী নদীর পাড় দখল করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতবাড়ি, মার্কেটসহ নানা স্থাপনা। একসময় এসব খাল-ছড়া অনেক প্রশস্ত থাকলেও এখন প্রভাবশালীদের দখলে তা অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

 

স্থানীয়রা জানান, ১০-১২ বছর আগেও এসব খালে মানুষ গোসল করতেন, মাছ ধরতেন, এমনকি স্পিডবোটও চলত। কিন্তু বর্তমানে সেগুলো ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। শহরের মিলনপুর (চৌধুরী বোর্ডিং ও সেলিম ট্রেড সেন্টার), বাজার ব্রিজের দক্ষিণ ও উত্তরে হোটেল জিরান এলাকা, বাজার মসজিদের পেছনের এলাকা, খাগড়াপুর (কমিউনিটি সেন্টারের পেছনে), মাস্টারপাড়ায় খাগড়াছড়ি খালের পূর্বাংশ, ইসলামপুর (ব্রিজের পশ্চিম পাশে) এবং কলাবাগানের উত্তরাংশে (ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন) ব্যক্তি উদ্যোগে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

 

খাগড়াছড়ি শহরে ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদী, খাল ও ছড়া দখলের অভিযোগ এনেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবোর তালিকা অনুযায়ী অবৈধ দখলদাররা হলেন: চৌধুরী বোর্ডিংয়ের মালিক প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী, নুরুল আলম, হোটেল নুরের ছালেহ আহম্মদ, ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আবুল হাসেম, গ্রামীণফোন সেন্টারের মধুসূদন দে, সেলিম ট্রেড সেন্টারের মোহাম্মদ সেলিম, ওয়ালটন শোরুমের হারুন রশিদ, গাজী হোটেলের গাজী শহীদ, রাজমিস্ত্রি সমবায় সমিতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বাবুল নাগ ও মো. নেছার উদ্দিন।

 

অবৈধ স্থাপনা অপসারণে জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছিল পাউবো। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিলেও দখলদাররা নিজেদের বৈধ দাবি করে পাল্টা চিঠি দেয়। এরপর থেকে বিষয়টি সেখানেই থেমে আছে।

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সভাপতি নির্মল কান্তি দাশ জানান, খাল-ছড়া বেদখল প্রতিরোধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে সরেজমিন অনুসন্ধান করে আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘শহরের মিলনপুর ব্রিজ ও খাগড়াপুর ব্রিজের পশ্চিমাংশে কয়েকজন প্রভাবশালী খাল দখল করে ধারক দেয়াল (গাইড ওয়াল) নির্মাণ করে জায়গা বাড়িয়ে নিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের খাগড়াছড়ি প্রকৌশল শাখা এসব ধারক দেয়াল নির্মাণে বিপুল টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।’

 

আরও পড়ুন: বেড়েই চলছে পাহাড় খেকোদের আগ্রাসন, খাগড়াছড়িতে অভিযান

 

খাগড়াছড়ি পৌরসভার কোনো অনুমোদন ছাড়া জনগণের টাকার এমন অপচয় নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ‘একসময় খাগড়াছড়ি শহরের আশপাশে বহু নদী, খাল ও ছড়া থাকলেও এখন প্রায় অস্তিত্ব নেই। প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকার কারণে নদী, খাল ও ছড়া বেদখল হয়ে যাচ্ছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি নদীতে গাইড ওয়াল নির্মাণ করে নদীর গতি পরিবর্তন করছেন, বানাচ্ছেন ভবন। এতে বিপন্ন হচ্ছে পর্যটন শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য।’

 

খাগড়াছড়ি পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল রব রাজা এবং খাগড়াছড়ি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক সুদর্শন দত্ত জানান, জেলায় ৩টি নদী এবং ৪১টি খাল ও ছড়া রয়েছে। শহরকে বাসযোগ্য রাখতে দ্রুত এগুলো দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার প্রত্যাশা করেন তারা।

 

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক হাসান আহমেদ বলেন, ‘খাগড়াছড়ি শহরের খাল, ছড়া ও নদী দখলমুক্ত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া হবে।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন