ঈদ আনন্দ নেই খুলনার পাটকল শ্রমিকদের

৩ সপ্তাহ আগে
‘গত দুই মাস ধরে কাজ বন্ধ। তবু প্রতিদিন সকালে মিলগেটে আসি, যদি পাওনা টাকা পাই, যদি আবার চালু হওয়ার খবর আসে। কিন্তু প্রতিদিনই খালি হাতে ফিরতে হয়’, কথাগুলো বলছিলেন খুলনার দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক খলিলুর রহমান।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আগে ঈদের এই সময়ে এই এলাকা জমজমাট থাকতো। অতিরিক্ত কাজ থাকতো, হাতে টাকা থাকতো। এখন কাজ নাই। ঈদ তো দূরের কথা, পরিবারের নিত্য খাবার জোগার করতেই কষ্ট হয়। কেউ জাকাত-ফিতরা দেয় কি না, সেই আশায় থাকি।


খলিলুর রহমানের মতো একই বাস্তবতায় দিন কাটছে খুলনা অঞ্চলের হাজারো পাটশ্রমিকের। একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া, উৎপাদন কমে আসা এবং রপ্তানি স্থবিরতায় পুরো পাটশিল্প এখন গভীর সংকটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনে, ফিঁকে হয়ে গেছে তাদের ঈদের আনন্দ।


খুলনার খালিশপুর, দৌলতপুরসহ পাটশিল্প নির্ভর এলাকাগুলোতে এক সময় ঈদের আগে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও এখন সেখানে বিরাজ করছে সুনশান নীরবতা। দৌলতপুর জুট মিল গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘লে-অফ’ ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কাঁচা পাটের উচ্চমূল্য ও লোকসানের অজুহাতে তিন বছর ধরে ইজারায় চালানো মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত শ্রমিক হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।


আরও পড়ুন: ডুমুরিয়ায় খাল খনন শুরু, জলাবদ্ধতা নিরসনে আশার আলো

শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে ঈদের আগে দিন-রাত কাজ করতাম। এখন কাজই নাই। ঘরে বসে থাকতে হয়, আয় নেই—সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। নারী শ্রমিক শাহানারা বেগম বলেন, মিল বন্ধ হওয়ার পর থেকে আয় একেবারেই বন্ধ। ঘরে খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে। ঈদ কিভাবে করবো, সেটাই জানি না।

খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের মধ্যে বেসরকারিভাবে চালু চারটির তিনটিতেই উৎপাদন সীমিত আকারে চলছে। অন্যদিকে বেসরকারি পাটকলগুলোতে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। একই সঙ্গে পাট ও কাঁচা পাট রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়ায় পুরো খাতেই তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।


পাটখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচা পাটের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য শরীফ মো. শহীদুজ্জামান (সজীব) বলেন, ‘সরকার, মালিক ও শ্রমিকসব পক্ষকে নিয়ে এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। না হলে পাটশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন: বন্ধ পাটকল চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী শরীফুল

এদিকে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) খুলনা জোনের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) জিএএম মাহবুব উর রশীদ জুলফিকার বলেন, বন্ধ থাকা পাটকলগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু সমস্যা থাকলেও দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। মিলগুলো চালু হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়বে।

খুলনা অঞ্চলে বর্তমানে ৯টি রাষ্ট্রায়ত্তসহ প্রায় ২০টি পাটকল এবং প্রায় সমান সংখ্যক কাঁচা পাট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ঈদের আনন্দ যেখানে থাকার কথা ছিল উৎসবে ভরা, সেখানে এখন মিলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের চোখে ভাসছে অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষা কবে খুলবে মিল, কবে ফিরবে কাজ, কবে আবার স্বাভাবিক হবে জীবন।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন