রসুলুল্লাহর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহ যখন এক চরম সংকটের মুখে, তখন সাকিফা বনি সায়েদায় খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে যে কালজয়ী বক্তব্য প্রদান করেন, তা আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজ সংস্কারকদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। এই ভাষণে তিনি ক্ষমতাকে ভোগবিলাসের বস্তু হিসেবে নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল আমানত ও গুরুদায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরেন।
ভাষণের শুরুতে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করে বলেন,
হে লোকসকল! আমাকে আপনাদের ওপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে, অথচ আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এমন বিনয়বচন অভাবনীয়। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, খিলাফত বা নেতৃত্ব কোনো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়, বরং এটি একটি সেবা করার সুযোগ। তিনি জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদি তিনি সঠিক পথে চলেন তবে যেন তারা তাকে সাহায্য করে, আর যদি তিনি ভুল পথে পরিচালিত হন তবে যেন তারা তাকে সংশোধন করে দেয়। এটি ছিল সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহিতার এক অনন্য উদাহরণ, যা আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে তিনি এক অবিস্মরণীয় ঘোষণা দেন। তিনি বলেন,
আপনাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দুর্বল, আমার কাছে সে শক্তিশালী, যতক্ষণ না আমি তাকে তার পাওনা অধিকার আদায় করে দিই। আর আপনাদের মধ্যে যে শক্তিশালী, আমার কাছে সে দুর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে অন্যের হক (অধিকার) আদায় করে নিই। এই একটি বাক্যেই তিনি তৎকালীন ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন।
আরও পড়ুন: খিলাফতের দায়িত্ব নিয়ে হজরত ওমর (রা.) যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন
যেখানে বংশমর্যাদা আর শক্তির দাপট ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সেখানে তিনি ঘোষণা করলেন যে, রাষ্ট্রের চোখে সবাই সমান এবং মজলুমের অধিকার রক্ষাই হবে সরকারের প্রধান কাজ।
শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্যের সীমা কতটুকু হবে, তাও তিনি এই ভাষণে অত্যন্ত নিপুণভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করি, ততক্ষণ আপনারা আমার আনুগত্য করবেন।
কিন্তু আমি যদি আল্লাহ ও তার রসুলের অবাধ্য হই, তবে আমার প্রতি আপনাদের আনুগত্য করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপ্রধানের কোনো সিদ্ধান্ত যদি শরিয়তের পরিপন্থী হয়, তবে জনগণ তা মানতে বাধ্য নয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি একনায়কতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে খিলাফতে রাশেদার বুনিয়াদকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।
পরিশেষে, তিনি জাতির সামগ্রিক নৈতিকতা ও সাহসিকতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, যে জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ করা ত্যাগ করে, আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন। আর যে জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাদের ওপর সামগ্রিক বিপদ ও মুসিবত চাপিয়ে দেন। হজরত আবু বকর রা.-এর এই ভাষণটি আজও প্রতিটি মুসলিম শাসকের জন্য আয়নার মতো।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র ক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর ভয়, জনগণের সেবা এবং ইনসাফের কঠোর বাস্তবায়ন। তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারিখুল খুলাফা
]]>
১ মাস আগে
৫







Bengali (BD) ·
English (US) ·