ইরানে ট্রাম্পের শেষ লক্ষ্য কী, কীভাবে শেষ হতে পারে যুদ্ধ?

১ দিন আগে
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের দুই দশকেরও বেশি সময় পর, ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের ওপর হামলা যত বাড়ছে, ততই যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য কী– তা নিয়ে পরিবর্তিত ও কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে: ওয়াশিংটনের শেষ লক্ষ্য আসলে কী?

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এরপরের হামলাগুলোতে পারমাণবিক স্থাপনা, বেসামরিক এলাকা এবং তেল ও পানি শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

 

এর জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যার লক্ষ্য ছিল ইসরাইল ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো। তেহরান জানিয়েছে, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন দূতাবাস।

 

এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ১,২০০ জনের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে দেড় শতাধিক শিশু রয়েছে, যারা একটি স্কুলে বোমা হামলায় মারা যায়। এছাড়া সাত মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও তার প্রশাসন কখনোই স্পষ্ট করে বলেনি এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চায় তারা। 

 

আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘যৌন নির্যাতনে’র নথি প্রকাশ

 

গত ১০ দিনের যুদ্ধে ট্রাম্প যেসব অবস্থান নিয়েছেন, সেগুলো কীভাবে বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়েছে এবং কতটা বাস্তবসম্মত– তা বিশ্লেষণ করেছে আল জাজিরা। 

 

শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন

 

২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু হয় খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তিনি ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন এবং এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

 

ট্রাম্প প্রশাসন কখনো সরাসরি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ শব্দটি ব্যবহার না করলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপগুলো বর্তমান ইরানি প্রশাসনের পতন ঘটানোর উদ্দেশেই নেয়া হয়ে থাকতে পারে।

 

পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা হায়দার সাইদ বলেন, ‘হামলার উদ্দেশ্য ছিল শাসনব্যবস্থার তাৎক্ষণিক আত্মসমর্পণ এবং একটি গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করা।’

 

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ সেলুম বলেছেন, ট্রাম্পের কৌশলের পেছনে একটি ‘অঘোষিত বাজি’ কাজ করছিল। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, 

ধারণাটি ছিল যে, মাথা এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে দিলে পুরো ব্যবস্থা হয় ভেঙে পড়বে, নয়তো এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে পরবর্তীতে যা-ই গড়ে উঠুক, তা আর যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে না।

 

কিন্তু বাস্তবে, খামেনি ছাড়াও অনেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হলেও ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বড় ধরনের ভাঙনের কোনো প্রমাণ এখনো দেখা যায়নি। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ৫৬ বছর বয়সি ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করে ইরান। 

 

আরও পড়ুন: খামেনির মৃত্যু: ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্ষমতা ছাড়তে বললেন পাহলভি

 

মুস্তফা হায়দার সাইদ বলেন, ‘আমার মনে হয় এটি (ইরানে হামলা) ট্রাম্পের দিক থেকে একটি ভুল হিসাব ছিল, কারণ তারা বুঝতে পারেনি যে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতা আছে।’

 

আইআরজিসি ও ইরানি কূটনীতিকদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা

 

যুদ্ধ বা কথিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্পের বক্তব্যে কখনো চুক্তির আহ্বান, আবার কখনো ইরান ধ্বংসের কথা শোনা গেছে।

 

শুরুতে তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ করে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান এবং বিনিময়ে দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেন। পরে তিনি ইরানি কূটনীতিকদেরও পক্ষ বদলের আহ্বান জানান।

 

কিন্তু আইআরজিসি-ই এখন ইরানের পাল্টা হামলার নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলাও পরিচালনা করছে। অন্যদিকে ইরানি কূটনীতিকরা প্রকাশ্য চিঠিতে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, তারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

সেলুম বলেন, ‘আইআরজিসি ইতোমধ্যে নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ঘোষণা করেছে। আর ট্রাম্প তাদের একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বোমা হামলা চলতে থাকলে এই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার রাজনৈতিক সুযোগই নেই।’ 

 

ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা

 

ট্রাম্প ও তার দল বারবার বলে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সেগুলো তৈরির কারখানা এবং নৌবাহিনী ধ্বংস করাও যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য।

 

মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইতোমধ্যে ইরানের নৌবাহিনীর সম্পদ, এমনকি শ্রীলঙ্কা উপকূলে থাকা একটি যুদ্ধজাহাজও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। হামলা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর ওপরও। দুই দেশই বলছে, তারা এখন ইরানের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। 

 

আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করে ইরান যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত: ট্রাম্প

 

তবে সেলুমের মতে, শুধু সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক ফলাফল চায়, তা অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারবে না।’ 

 

ইরানের নেতা ঠিক করবেন ট্রাম্প!

 

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘মহান ইরানি জনগণকে বলছি, স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। আমরা শেষ করলে আপনারা আপনাদের সরকার দখল করে নেবেন।’

 

পরে তিনি বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সরকারে তিনি চান ইরানের ভেতরের কেউ নেতৃত্ব দিক, যা কার্যত নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভির সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইরানে ফিরে নেতৃত্ব দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন।

 

তবে ট্রাম্প আবার বলেছেন, তিনি মোজতবা খামেনিকে ইরানের নেতা হিসেবে মেনে নেবেন না এবং নতুন নেতা বাছাইয়ে তার সরাসরি ভূমিকা থাকা উচিত।

 

গত ৬ মার্চ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, 

নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সাথে আর কোনো চুক্তি হবে না! শাসকগোষ্ঠী আত্মসমর্পণের পর, মহান ও গ্রহণযোগ্য নেতা নির্বাচন করতে হবে।

 

তেহরানের প্রতিক্রিয়া অবশ্য একই আছে­– বোমা হামলার মধ্যে কোনো আলোচনা, আত্মসমর্পণ এবং বাইরের চাপিয়ে দেয়া নেতৃত্ব নয়।

 

আরও পড়ুন: ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে যুক্ত থাকতে চান ট্রাম্প!

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোজতবা খামেনির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ওয়াশিংটনের পরিকল্পনার সরাসরি প্রত্যাখ্যান। সেলুম বিশ্বাস করেন, মোজতবার সর্বোচ্চ নেতা হওয়া ইঙ্গিত দেয় যে আইআরজিসি ইরানে প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে তার ভূমিকা সুসংহত করেছে।

 

কুর্দি হামলার শঙ্কা

 

আরেকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন কুর্দি বাহিনীকে ইরানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করেছে বলে জানা যায়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এবং ইরবিলের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতিও আছে।

 

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভেতরে কুর্দি বাহিনী পাঠানো অনেক বেশি জটিল হবে এবং এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।

 

স্থল আক্রমণ

 

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের জন্য ইরান প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ট্রাম্প প্রশাসনও স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি।

 

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক কামরান বোখারি বলেছেন, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এটি (ইরানে স্থল আক্রমণ) করা খুবই কঠিন হবে।

 

তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে ব্যর্থতার কারণে স্থল সেনা সবচেয়ে অসম্ভব বিকল্প।’

 

ইসরাইলের লক্ষ্য কী? 

 

দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখে আসছে ইসরাইল।

 

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাহজুব জাইরি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর-এর পর ইসরাইল এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে তোলার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখছে। 

 

আরও পড়ুন: আমরা মার্কিন স্থলবাহিনীর অপেক্ষায় আছি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

 

তার ভাষ্য, 

ইসরাইল যা করার পরিকল্পনা করছে তা হলো ৭ অক্টোবরকে তারা মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করবে, ঠিক যেমনটি ৯/১১-এর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করেছিল।

 

মাহজুব আরও বলেন, ‘ইরানসহ, চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল, প্রান্তিককরণ এবং পরাজিত করতে চায় ইসরাইল।’

 

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তবসম্মত শেষ লক্ষ্য কী?

 

বিশ্লেষকদের মতে, ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে ‘চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সমঝোতা’।

 

কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রেগ বলেন, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের শাসনব্যবস্থার কিছু অংশের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোলা রাখতে পারে, যদি তারা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক নীতিতে কিছু ছাড় দেয়।

 

পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের সায়েদের মতে, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

 

তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে চাইবেন, ঘোষণা করবেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং যুদ্ধ শেষ করবেন। তিনি (ট্রাম্প) বলতে পারেন যে, খামেনি নিহত হয়েছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ধ্বংস হয়েছে– এটাই বিজয়। কারণ স্থল আক্রমণের অর্থ হবে অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন