খুলনা মহানগরী থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত এই মসজিদকুড় গ্রাম। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ছুটে আসেন এই প্রাচীন স্থাপনাটি এক নজর দেখতে। এই মসজিদকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিচিতি।
নির্মাণের ইতিহাস
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, পঞ্চদশ শতকে সুলতান জালাল উদ্দীন মুহম্মদ শাহের সময় দক্ষিণবঙ্গে ইসলাম প্রচারে আসেন হজরত খানজাহান আলী (রহ.)। তার নেতৃত্বে একটি কাফেলা যশোর ও মুরালী অতিক্রম করে কপোতাক্ষ নদপথে সুন্দরবন অঞ্চলে পৌঁছায়। এই কাফেলার একটি অংশের নেতৃত্ব দেন তার ঘনিষ্ঠ অনুসারী বোরহান খাঁ (বুড়ো খাঁ) এবং তার পুত্র ফতেহ খাঁ। তারা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার-প্রসারের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক নানা স্থাপনা নির্মাণ করেন, যার মধ্যে অন্যতম এই নয় গম্বুজ মসজিদ।
সময়ের পরিক্রমায় একসময় জনবসতি কমে গেলে মসজিদটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এটি ঘন জঙ্গল ও নদীর পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। বহু বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় স্থানীয়রা নতুন করে বসতি স্থাপন করতে গিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করেন। তখন মাটির নিচে চাপা পড়া এই স্থাপনাটি পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় বলেই এর নাম হয়ে যায় ‘মসজিদকুড়’। আর সেই নামেই পরিচিতি পায় পুরো গ্রাম। বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। এখানে একসঙ্গে প্রায় ২০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
আরও পড়ুন: রহস্যঘেরা ‘মেদিগঞ্জ মসজিদ’, অন্ধকার নামলেই জিনের কান্না!
অনন্য স্থাপত্যশৈলী
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি অত্যন্ত অনন্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। বর্গাকার এই মসজিদের বাইরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ দশমিক ৭৬ মিটার এবং ভেতরে প্রায় ১২ দশমিক ১৯ মিটার। চার কোণায় রয়েছে উঁচু গোলাকার বুরুজ, যা ওপরের দিকে সরু হয়ে গেছে এবং প্রতিটিতে রয়েছে আনুভূমিক বন্ধনী। চারদিকে ধনুক-বক্র কার্নিশ সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির সুস্পষ্ট পরিচয় বহন করে। মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে তিনটি করে মোট নয়টি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। কিবলা প্রাচীরে রয়েছে তিনটি মেহরাব।
মসজিদের অভ্যন্তরে চারটি প্রস্তর-নির্মিত স্তম্ভ পুরো ছাদকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। এই স্তম্ভগুলোর ওপর খিলানের মাধ্যমে ছাদটি নয়টি সমান বর্গক্ষেত্রে বিভক্ত হয়েছে এবং প্রতিটি অংশের ওপর একটি করে গম্বুজ স্থাপিত। মাঝের গম্বুজটি তুলনামূলকভাবে বড়। একসময় মসজিদটির দেয়ালজুড়ে ছিল পোড়ামাটির সমৃদ্ধ অলংকরণ। বর্তমানে অনেক অলংকার হারিয়ে গেলেও কিছু অংশ এখনও টিকে আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদসহ খানজাহান আলীর অন্যান্য স্থাপনার এবং বরিশালের কসবা মসজিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।
আরও পড়ুন: সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে সাড়ে ৫০০ বছরের মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই এই মসজিদ দেখে বড় হয়েছি। অনেক দূর থেকে মানুষ আসে, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা আর প্রচারণা বাড়ালে আরও বেশি পর্যটক আসবে।’
মসজিদটি দেখতে আসা এক দর্শনার্থী জানান, ‘এখানে এসে মনে হয় ইতিহাসের ভেতরে চলে এসেছি। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের মতোই স্থাপত্যশৈলী দেখা যায়, কিন্তু এই জায়গাটা এখনও অনেকটাই অজানা।’
কপোতাক্ষ নদ তীরবর্তী ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও পর্যটন দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিচর্যার অভাবে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাযথ সংরক্ষণ, আধুনিক পর্যটন সুবিধা এবং প্রচারণা বাড়ানো গেলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
]]>
৩ সপ্তাহ আগে
৬








Bengali (BD) ·
English (US) ·