ইউনূস সরকারের ১৮ মাস: সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান

৪ সপ্তাহ আগে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটেছিল দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। আজ ১৮ মাস পর, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই সরকারের অর্জন ও ব্যর্থতার খতিয়ান মেলালে দেখা যায় এক জটিল সমীকরণ। একদিকে যেমন আছে রাষ্ট্র সংস্কারের সাহসী পদক্ষেপ, অন্যদিকে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা ও মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে দেশে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এতে দেশব্যাপী বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হন। টালমাটাল এক পরিস্থিতিতে নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে কৃতিত্ব অর্জন করেছে। ঝুলিতে জমা হয়েছে অসংখ্য ব্যর্থতাও।


শান্তি ও স্থিতিশীলতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা


গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার একটি ধসে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করার চেষ্টা চালিয়েছে। যদিও জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হওয়ায় ছোটখাটো ব্যর্থতাগুলোও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।


দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে দেশে এক ধরনের শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা ও পুলিশের অনুপস্থিতি ছিল। সেনাবাহিনী ও পুনর্গঠিত পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে সেই চরম অরাজকতা কাটিয়ে উঠে জনজীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা একটি বড় অর্জন ছিলো সরকারের সামনে।


নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশনগুলো তাদের কাজ অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।


অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, খেলাপি ঋণের লাগাম টানা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেয়া সরকারের বড় সাফল্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকিয়ে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪.০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

 


নতুন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনীতি বিষয়ে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো সংস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ ও সহায়তা নিশ্চিত করা গেছে।


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা এবং গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে কমিশন গঠন জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়েছে।


সংস্কার কমিশন ও জুলাই সনদ


অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর সমান্তরালে, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকেই মূলত ‘জুলাই সনদ’ বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল ম্যান্ডেট হিসেবে দেখা হয়। ১০টি সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের যে সংস্কার কাজের শুরু হয়েছে; তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।


রাষ্ট্র সংস্কার কমিশনসমূহ


রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক করার লক্ষ্যে সরকার প্রধানত ১০টি বড় সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে কমিশনগুলোর কাজের অগ্রগতি ও মূল লক্ষ্যগুলো নিম্নরূপ:

 

কমিশনলক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
সংবিধান সংস্কার কমিশন স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে কাজ করা।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন এবং আরপিও (RPO) সংশোধন।
পুলিশ সংস্কার কমিশন পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তর করা।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন বিচারকদের নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা আনা এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন দুদককে একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর আইনি কাঠামো তৈরি।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সরকারি চাকরিতে মেধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো।


এ ছাড়াও স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, শ্রম অধিকার এবং নারীবিষয়ক আরও চারটি কমিশন তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। এই কমিশনগুলোর মূল লক্ষ্য হলো— ভবিষ্যতে যাতে কেউ আর স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।

 

জুলাই জাতীয় সনদ


জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট ধরা হয়। ফলে জাতির সামনে জুলাই জাতীয় সনদ প্রস্তাব করা ছিল এ সরকারের অন্যতম সফলতা। ‘জুলাই সনদ’ মূলত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার একটি লিখিত বা অলিখিত সামাজিক চুক্তি। এটি কোনো সাধারণ আইনি নথি নয়, বরং আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি জাতীয় লক্ষ্যনামা।


আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ইস্যু করলেন রাষ্ট্রপতি


দীর্ঘদিন অধরা থাকা গণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্ব হয়ে উঠেছে এ সনদের উল্লেখযোগ্য খুঁটি। রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়া এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই গণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্ব।


জুলাই সনদকে তরুণ প্রজন্মের একটি অঙ্গীকার হিসেবে এড্রেস করেছে সরকার, যা সরকারকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে— সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, ব্যবস্থার নয়।


সংস্কার কমিশন ও জুলাই সনদের সম্পর্ক

সংস্কার কমিশনগুলোর মূল কাজ হলো জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষাকে আইনি ও কাঠামোগত রূপ দেয়া। অর্থাৎ, ছাত্র-জনতা রাজপথে যা চেয়েছে, কমিশনগুলো তা সংবিধানে বা আইনে সংযুক্ত করার কাজ করছে। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতার বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘আমরা শুধু নির্বাচনের জন্য আসিনি। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে কোনো স্বৈরাচার আর কখনোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। আমরা জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করতে পারি না।’


জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

 

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার বিচারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত দেড় বছরে একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ২০২৪ সালের সেই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ইতোমধ্যে রায় ঘোষণা করেছে।


ঐতিহাসিক রায়: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড


২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। এই রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।


ট্রাইব্যুনাল তার ৪৫৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেছে যে, শেখ হাসিনা ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ (ঊর্ধ্বতন কমান্ডারের দায়) অনুযায়ী জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। রংপুরের আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড, ঢাকার চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ায় ছয়জন ছাত্রকে গুলি করে হত্যার পর প্রমাণ লোপাটে লাশ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় তার সরাসরি নির্দেশ ও উসকানি প্রমাণিত হয়েছে।


শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় তার অনুপস্থিতিতেই এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


আরও পড়ুন: যেসব অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ


 

পুলিশ ও ডিজিএফআইয়ের সংস্কার ও বিচার

 


জুলাই হত্যাকাণ্ডে মাঠপর্যায়ে সরাসরি যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে সরকার হার্ডলাইনে ছিলো। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।


এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক নজরদারি থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাজে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের অপারেশনাল কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলকে পূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে সরকার, যা এই বিচারপ্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছে দিয়েছে।


‘আয়নাঘর’ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার

 

শেখ হাসিনার পাশাপাশি এই বিচার প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকাও গুরুত্ব পেয়েছে।


সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই মামলায় ‘রাজসাক্ষী’ (Approver) হওয়ায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তার স্বীকারোক্তি থেকে জানা গেছে কীভাবে রাজনৈতিক নির্দেশে পুলিশকে একটি ‘খুনি বাহিনীতে’ রূপান্তর করা হয়েছিল।


আরও পড়ুন: ৭ দিনের মধ্যে গুম-খুনে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে ‘মায়ের ডাক’

 

উচ্চ আদালতের সামনে মানববন্ধন করেন গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যরা। ছবি: সময় সংবাদ


ডিজিএফআইয়ের গোপন বন্দীশালা বা ‘আয়নাঘর’ থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের সাক্ষ্য এবং সেখানে সংঘটিত অমানবিক নির্যাতনের প্রমাণাদি এই বিচারকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।


জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ এবং গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তর করা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।


আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের চিকিৎসা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এই ফাউন্ডেশন যাত্রা শুরু করে।


ফাউন্ডেশন প্রতিটি শহীদ পরিবারকে এককালীন ৫ লাখ টাকা এবং আহতদের সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত প্রায় ২,৭০০-এর বেশি পরিবারকে ৫৩ কোটি টাকার বেশি সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।


গুরুতর আহতদের ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে সরকারি খরচে চিকিৎসা এবং যাদের দেশে চিকিৎসা সম্ভব নয়, তাদের বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।


একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে যাতে কোনো শহীদ বা আহত ব্যক্তি সহায়তার বাইরে না থাকে। এছাড়া '১৬০০০' হেল্পলাইনের মাধ্যমে সরাসরি অভিযোগ ও অনুরোধ শোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকার বিজয়নগরে ফাউন্ডেশনের জন্য নিজস্ব জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যেখানে শহীদদের স্মরণে একটি স্থায়ী কমপ্লেক্স নির্মিত হচ্ছে।


জুলাই স্মৃতি জাদুঘর (গণভবন): ইতিহাসের সাক্ষী


ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ও জনগণের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর করা এই সরকারের একটি বড় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সফলতা।

 

জাদুঘরে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময়কার দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি), ছাত্র-জনতার ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী এবং আন্দোলনের ভিডিও ফুটেজ প্রদর্শন করা হচ্ছে। গত ১৬ বছরের আয়নাঘর, গুম, খুন এবং দুর্নীতির প্রামাণ্য চিত্র ও নথিপত্র এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এমনকি শেখ হাসিনার দেশত্যাগের শেষ মুহূর্তের দৃশ্যগুলোও ডিজিটালি এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে জাদুঘরটি জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এটি এখন একটি ‘ন্যাশনাল মেমোরিয়াল’ হিসেবে স্বীকৃত।


আরও পড়ুন: জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে যারা আসবে তারা গণভবনে জনতার ঢলকে অনুভব করবে: প্রধান উপদেষ্টা
 

 

অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন

 


২০২৪ সালের অগাস্টে দায়িত্ব গ্রহণের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেয়েছিল একটি ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, তলানিতে ঠেকানো রিজার্ভ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির এক বিধ্বস্ত অর্থনীতি। দেড় বছর পর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে অর্থনীতির এই ক্ষতগুলো কেবল সেরে ওঠেনি, বরং বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপে স্থিতিশীলতার এক নতুন নজির তৈরি হয়েছে।


ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও ৫ ব্যাংকের একীভূতকরণ

 

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে দুর্বল ও লোকসানি ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সাথে একীভূত করার মাধ্যমে।


খেলাপি ঋণে জর্জরিত এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতায় থাকা ৫টি দুর্বল ব্যাংককে (যার মধ্যে এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি ব্যাংক ছিল) শক্তিশালী রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হয়েছে। এর ফলে আমানতকারীদের আতঙ্ক দূর হয়েছে এবং ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কমেছে।


ইসলামী ব্যাংকসহ ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করা হয়েছে। পেশাদার ব্যাংকারদের মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠন করায় আমানত প্রবাহ আবার বাড়তে শুরু করেছে।


খেলাপি ঋণ উদ্ধার: বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে বড় বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেড় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়েছে।


এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন,

আমরা ব্যাংকিং খাতকে আইসিইউ থেকে বের করে এনেছি। একীভূতকরণের ফলে এখন আর কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়ার সংস্কৃতি আমরা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছি।



রেকর্ড রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ


রিজার্ভের যে ধারাবাহিক পতন গত কয়েক বছর ধরে চলছিল, তা রোধ করা এই সরকারের অন্যতম বড় জাদুকরী সাফল্য।

 

২০২৪-এর শেষে রিজার্ভ যেখানে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল, ২০২৬-এর শুরুতে তা পুনরায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের (বিপিএম-৬ পদ্ধতি) ঘর অতিক্রম করেছে।

 

সূচক২০২৪ (অগাস্ট)২০২৬ (ফেব্রুয়ারি)
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায়) ২৭+ বিলিয়ন ডলার
ব্যাংকিং সুশাসন রাজনৈতিক দখলদারিত্ব ও তারল্য সংকট। ৫ ব্যাংক একীভূত ও স্বাধীন বোর্ড।
মাসিক রেমিট্যান্স ১.৮ - ২ বিলিয়ন ডলার। ২.৫ - ৩ বিলিয়ন ডলার।
টাকার মান (প্রতি ডলার) অস্থির (১২০-১২৫ টাকা) স্থিতিশীল (১১৫-১১৭ টাকা)


অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প স্থগিত করে সেই টাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসিতায় লাগাম টেনে শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে। একইসঙ্গে আইএমএফ (IMF), বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি নমনীয় ঋণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের অস্থিরতা দূর করেছে।


 


আরও পড়ুন: বিনিয়োগের জটিলতা কমাতে চালু হলো ‘বাংলাবিজ’ প্লাটফর্ম

 

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ইন্টারনেট অধিকার

 

গত ১৫ বছরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ এবং ঘনঘন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে সরকার গণমাধ্যম ও সাইবার অধিকারের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।


সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধকারী আইনগুলো সংস্কারে হাত দেয়। বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন (যা আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছিল) বাতিল বা আমূল সংস্কার করা হয়েছে। বিশেষ করে মানহানির মামলায় সাংবাদিকদের সরাসরি গ্রেফতারের বিধান বাতিল করা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।


গত এক দশকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা শত শত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।


প্রবীণ সাংবাদিক কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হয়েছে, যা গণমাধ্যমকে সরকারি প্রভাবমুক্ত রাখতে নীতিমালা তৈরি করছে।


ইন্টারনেট অধিকার ও ডিজিটাল স্বাধীনতা


আগের সরকারের আমলে আন্দোলন বা অস্থিরতার সময় ইন্টারনেট বন্ধ রাখা ছিল একটি নিয়মিত ঘটনা। বর্তমান সরকার একে ‘মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।


গত দেড় বছরে চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেনি। বরং ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে এবং ডাটার দাম কমাতে অবকাঠামোগত কাজ শুরু করেছে।


আরও পড়ুন: বিএসসিএলের স্টারলিংক সেবার সেলস এজেন্ট হলো বি-ট্র্যাক সল্যুশনস


এছাড়া টিভি টকশো এবং সংবাদপত্রে সরকার ও উপদেষ্টাদের ভুলত্রুটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল।


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: নতুন উচ্চতায় অংশীদারিত্ব

 

অগাস্ট বিপ্লবের পর প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেয়। গত দেড় বছরে এই সম্পর্ক কেবল মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চুক্তিতে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের শেষদিকে ইউএসএআইডি (USAID)-এর মাধ্যমে সুশাসন, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের জন্য প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।


আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ৯০ শতাংশ পণ্য রফতানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে বাংলাদেশ: বাণিজ্য উপদেষ্টা


গত দেড় বছরে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের ঘনঘন ঢাকা সফর এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বৈঠক দুই দেশের আস্থার সম্পর্ককে সুসংহত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফেরত আনতে কারিগরি এবং আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য বিশেষ সমঝোতা স্মারক সই করেছে।


যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও সরকার অন্য শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সফল হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। ইইউ বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।


ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকার ‘পারস্পরিক মর্যাদা ও সমতা’র নীতি গ্রহণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে বৈরিতা দেখা দিলেও বাণিজ্যিক যোগাযোগ সচল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।


জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ড. ইউনূসের ভাষণের পর রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর আবার ফিরেছে। রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে সরকার সফল হয়েছে।


গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও লজিস্টিকস সহযোগিতা

 

ডিক্লারিফিকেশন অব ইন্টারন্যাশনালিজম-এর আওতায় বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সরকার কৌশলগত চুক্তি করেছে, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করবে।


বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্রদের সাথে তথ্য আদান-প্রদান ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।


এ বিষয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন,

আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ছি যেখানে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রই হবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব এখন আর দাতা-গ্রহীতার নয়, বরং তা হবে সমমর্যাদার অংশীদারিত্বের।’



পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন,

আমরা কোনো বিশেষ বলয়ের দিকে ঝুঁকে নেই। তবে যারা আমাদের গণতন্ত্র ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াচ্ছে, তারা আমাদের অগ্রাধিকার পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী।


শিক্ষা সংস্কার কমিশন এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ


বিগত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম পদক্ষেপ ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলীয়করণমুক্ত ও বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে 'শিক্ষা সংস্কার কমিশন' গঠন এবং স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে 'সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ' (বা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ) নিয়ে আসা হয়েছে।

 

অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা সংস্কার কমিশন বাংলাদেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে।


বিতর্কিত ‘নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৩’ থেকে সরে এসে শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ উপযোগী একটি যৌক্তিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তক থেকে দলীয় ইতিহাস ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তু বাদ দেয়া হয়েছে।


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করে ‘ছাত্র সংসদ’ ভিত্তিক সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।


এছাড়া এনটিআরসিএ (NTRCA) এবং পিএসসি (PSC)-এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা এবং শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এবং সাধারণ শিক্ষার সাথে সমন্বয় রেখে আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে বৃত্তিমূলক ও কর্মমুখী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


দীর্ঘদিনের টালবাহানা কাটিয়ে 'সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অর্ডিন্যান্স'-এর অধীনে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি একক ও মানসম্মত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি স্থায়ী করা হয়েছে।

 


আরও পড়ুন: ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারি


বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন গবেষণার জন্য নিজস্ব তহবিল গঠন করতে পারে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়া বরাদ্দ ব্যয় করতে পারে, তার আইনি ভিত্তি দেয়া হয়েছে।


পে-স্কেল


অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে কাজ করেছে।


সরকার বিদ্যমান বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূর করতে একটি উচ্চপর্যায়ের 'পে-স্কেল সংস্কার কমিশন' গঠন করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো নিম্নধাপের কর্মচারীদের সঙ্গে উচ্চধাপের কর্মকর্তাদের বেতনের বিশাল ব্যবধান কমিয়ে আনা।


আরও পড়ুন: কর আদায় না বাড়িয়ে পে-স্কেল বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি বাড়বে: গভর্নর


গত দেড় বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে যাতে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে।


গ্রেড সংখ্যা কমানো এবং বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার অসঙ্গতি দূর করা এই সংস্কারের অন্যতম প্রধান দিক।


মব ভায়োলেন্স ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

 


বিগত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক অর্জন থাকলেও ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং বিচারবহির্ভূত গণপিটুনি দমনে সরকার দৃশ্যমানভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে শুরু করে আদালত প্রাঙ্গণ পর্যন্ত এই সহিংসতার ছায়া পড়েছে।

 

উল্লেখযোগ্য কিছু মব ভায়োলেন্সের ঘটনা মানুষের হৃদয়ে প্রখর দাগ কেটে গেছে। এবং সরকারকেও বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল।

 

ঢাবিতে তোফাজ্জল হোসেন হত্যাকাণ্ড (সেপ্টেম্বর ২০২৪): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে কয়েক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাকে প্রথমে মারধর করা হয়, তারপর ভাত খাওয়ানো হয় এবং পরে আবার পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এই ঘটনায় সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।


আরও পড়ুন: আইনজীবী আলিফ হত্যা: চিন্ময় দাসসহ ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন
 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শামীম মোল্লা হত্যাকাণ্ড (সেপ্টেম্বর ২০২৪): জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম মোল্লাকে চ্যান্সেলর ভবনের সামনে এবং পরবর্তীতে প্রক্টরিয়াল বডির উপস্থিতিতেই মারধর করে হত্যা করা হয়। প্রক্টরিয়াল অফিসের ভেতরে পুলিশের উপস্থিতিতে এই পিটুনির ঘটনা ঘটেছিল, যা প্রশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।


আইনজীবী আলিফ হত্যা (নভেম্বর ২০২৪): চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর সংঘর্ষের সময় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আদালত চত্বরের মতো একটি সুরক্ষিত জায়গায় আইনজীবীকে কুপিয়ে হত্যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা ফুটিয়ে তোলে।


মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়ে মব জাস্টিস বা গণপিটুনি এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।


আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে অন্তত ২৯৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই নিহত হয়েছেন ১৯৭ জন। (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫)


অধিকার-এর প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে পরবর্তী ১৬ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন (৩ ডিসেম্বর ২০২৫)।


মব ভায়োলেন্সের ঘটনায় ৯,০০০-এর বেশি মানুষকে আসামি করা হলেও গ্রেফতারের হার মাত্র ১.২৭ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে চার্জশিট থেকে মূল অভিযুক্তদের বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে (সূত্র: ISHR রিপোর্ট, নভেম্বর ২০২৫)।


মাজার ও দরগাহে হামলার উল্লেখযোগ্য ঘটনা


২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সারা দেশে মাজার কেন্দ্রিক সহিংসতার দেখা গেছে।


সিলেট শাহপরান মাজার (সেপ্টেম্বর ২০২৪): সিলেটের ঐতিহাসিক শাহপরান (র.) মাজারে শত শত উগ্রবাদী লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায় এবং বাৎসরিক ওরশ বন্ধ করে দেয়। তারা মাজারে থাকা বিভিন্ন অবকাঠামো ভাঙচুর করে।


নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগী ও লেংটার মাজার: নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও সোনারগাঁ এলাকায় অন্তত ৪টি মাজার পুরোপুরি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এর মধ্যে দেওয়ানবাগী পীরের আস্তানায় হামলার ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত সহিংস।


সিরাজগঞ্জ ও পাবনা: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও পাবনার চাটমোহরে ৩টি মাজার গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। হামলাকারীরা বুলডোজার ও ভারী হাতুড়ি ব্যবহার করে মাজারের গম্বুজ ও কাঠামো ধ্বংস করে।


ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা: আশুলিয়া ও গাজীপুরে একাধিক পীরের আস্তানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।


কবর থেকে লাশ উত্তোলন ও পুড়িয়ে দেওয়ার বীভৎসতা


মব ভায়োলেন্সের সবচেয়ে চরম ও মর্মান্তিক রূপ ছিল মৃত মানুষের মরদেহের প্রতি অসম্মান। ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাসে সিরাজগঞ্জে এক পীরের মাজার থেকে তার লাশ তুলে প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে নিন্দা জানানো হয়।


আরও পড়ুন: নুরাল পাগলের লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আ.লীগ-বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপির নেতারা


পরিসংখ্যান: মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই দেড় বছরে মাজার কেন্দ্রিক সহিংসতায় সারা দেশে অন্তত ৫৫ থেকে ৬০টি মাজারে ছোট-বড় হামলার ঘটনা ঘটেছে। কবর থেকে লাশ তোলা বা পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৪টি।


আন্দোলন-সড়ক অবরোধ


দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই দেড় বছরে আন্দোলনের একটি বিশাল অংশ ছিল সড়ক অবরোধ কেন্দ্রিক।


স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর দেওয়া তথ্যমতে (৩১ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত সংগৃহীত এবং পরবর্তী প্রক্ষেপণ অনুযায়ী), অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরেই ১,৬০৪টি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার সময় এই সংখ্যা ২,০০০ অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হয়।


সরকারি হিসেবে অন্তত ১২৩টি ছোট-বড় সংগঠন বিভিন্ন সময়ে রাজপথে তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে।


বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, চাকরি স্থায়ীকরণ (যেমন: আনসার, গ্রাম পুলিশ, প্রাথমিক শিক্ষক), স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিলোপ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এসব আন্দোলন হয়েছে।


আরও পড়ুন: বগুড়ায় মহাসড়ক অবরোধ করে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ


রাজনৈতিক দলগুলোর (যেমন: বিএনপি, জামায়াত) বিভিন্ন দাবি এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচির কারণে অন্তত ৪০০টি রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও শোডাউন অনুষ্ঠিত হয়েছে।


শিল্পাঞ্চল বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে অন্তত ৩৫০টিরও বেশি শ্রমিক বিক্ষোভ ও কারখানা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে দীর্ঘসময় মহাসড়ক স্থবির ছিল।


মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের ৫৫১ দিন। গড়ে চারখানা আন্দোলন পার করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার নির্বাচনের দুয়ারে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাঁধে দায়িত্ব রেখে যাওয়ার সেই অঙ্গীকার সম্পন্ন করার আর কয়েক দিন বাকি।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন