সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় এক যুগ আগে দুই বিঘা জমিতে খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি জাতের ৩০টি আম গাছ রোপণ করেছিলেন রাজশাহী পুঠিয়ার ধাঁধাশ গ্রামের হবি মিয়া। বাণিজ্যিক সেই বাগান নিমিষেই কেটে উজাড় করলেন তিনি।
হবি মিয়ার ভাষ্য, আমের দাম নেই। তাই কেটে ফেললেন আমের বাগান। আম বাগান কেটে সবজির চাষ করবেন তিনি।
শুধু তিনিই নন, পুঠিয়া, পবা, চারঘাট, বাঘাসহ কয়েকটি উপজেলার অনেক বাগান কেটে ফেলেছেন গাছ। তাদের অভিযোগ, করোনার পর থেকে ন্যায্যমূল্য মিলছে না। উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। জাতের বৈচিত্র্যতা না থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর তুলনায় রাজশাহীতে দাম কম। আমের সংরক্ষণাগার না থাকা ও রফতানি কমায় ভরা মৌসুমে দামেও ধস নামে। এ কারণে আমবাগান কেটে ধান, গম, সবজি, আদা, হলুদ চাষে ঝুঁকছেন তারা।
বানেশ্বর হাটের আম ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমের দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। এক বিঘা জমির আমে চাষে বছর শেষে যে টাকা পাওয়া যাবে, ফসল চাষে তার থেকে বেশি টাকা পাওয়া যাবে। বিগত কিছু বছর ধরে আমের দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। তাই বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে আমের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এরপর এসব জমিতে মালিকরা ফসল ফলাবেন।’
আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ভরা মৌসুম, ৮ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যের লক্ষ্য
আম বাগানিরা জানান, করোনাকালীন সময়ে বিক্রি ও আমের দামের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন চাষিরা। সেই সময় অতিবাহিতের পাঁচ বছরেও চাঙ্গা হয়নি আমের বাজার।
তারা আরও জানান, করোনাকালীন সময় ছাড়াও রমজান মাস, ঈদ, পূজার ছুটির প্রভাব পড়ে আমের বাজারে। মূলত আমের মূল ক্রেতারা এসব ছুটির কারণে বড় বড় বিভাগীয় শহর ছেড়ে বাসায় ফিরেছিলেন। ফলে চাহিদা কমায় ভাটা পড়ে আমের দামে। লোকসান থেকে পরিত্রাণে বাধ্য হয়ে আমবাগান কেটে- ধান, গম, সবজি, আদা, হলুদ, পেয়ারা, বরই, ড্রাগনের চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা।
গেল দুই বছরে জেলার বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় সরকারি হিসেবে আমের বাগান কেটে ফেলা হয়েছে ৭১৪ হেক্টর জমির। সবচেয়ে বেশি আমের গাছ কাটা হয়েছে জেলার এই দুই উপজেলায়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো জেলায় উজাড় হয়েছে এক হাজার হেক্টরের বেশি আমের বাগান।
কৃষি বিভাগের তথ্য, জেলার ১৯ হাজারের মধ্যে শুধুমাত্র বাঘায় কাটা হয়েছে ৫১০ হেক্টরের বাগান। ২০৪ হেক্টর বাগান উজাড় হয়েছে চারঘাটে। অন্য উপজেলাগুলোতে আম গাছ কাটা হলেও কৃষি বিভাগের কাছে সে তথ্য নেই।
আরও পড়ুন: রমজানের বাজারে পাকা আম, কাটিমনে বাজিমাত কৃষকের
কাঠ কাটা শ্রমিক আবদুল মোমিনের আমের বাগান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমের দাম না পাওয়ার কারণে মানুষ প্রচুর গাছ কেটে ফেলছে। আম চাষে মুনফা পাচ্ছেন না। মৌসুমে বাজারে আমের যে দাম তাতে খরচ উঠে না। আর যে সব জেলায় আমের গাছ ছিল না, সেই সব এলাকায় এখন আমের বাগান হয়েছে। এরফলে চাহিদায় ভাটা পড়ছে। এতে করে আমের দামেও প্রভাব পড়েছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চলিকাশক্তি আম। এভাবে উজাড় হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আম বাণিজ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরসঙ্গে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষ জড়িত। আম বাণিজ্য সংকুচিত হলে তার প্রভাব এ অঞ্চলের মানুষের ওপর।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, ‘নানা কারণে চাষিরা আমবাগান কাটছেন। যেসব বাগানের আম গাছ কাটা হচ্ছে, সেসব জায়গায় নতুন জাতের বাগান করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার ১৯ হাজারের মধ্যে শুধুমাত্র বাঘা ও চারঘাটে কাটা হয়েছে ৭১৪ হেক্টর জমির বেশি বাগান।

৩ সপ্তাহ আগে
৯







Bengali (BD) ·
English (US) ·