২০ মাস পর কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে অধ্যক্ষ

১ সপ্তাহে আগে
নিয়োগ বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও প্রণোদনার টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আন্দোলনের মুখে বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে যান রংপুর নগরীর সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান।

প্রায় ২০ মাস পর বুধবার (২২ এপ্রিল) তিনি ফের বিদ্যালয়ে যোগদান করতে গেলে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। পরে পুলিশি পাহারায় বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।

 

সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ সূত্রে জানা যায়, নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এর আগে কয়েক দফা আন্দোলন করেন এবং বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দেন। 

 

সবশেষ ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবসহ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে উধাও হন অধ্যক্ষ শাহজাহান। এরপর তিনি আর ওই প্রতিষ্ঠানে আসেননি। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় তাঁর বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

 

এদিকে, বেতন-ভাতা ও স্বপদে বহাল চেয়ে শাহজাহান উচ্চ আদালতে রিট করেন। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত ৬০ দিনের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক, দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ ১২ মার্চ প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি সভা করেন।

 

অভিযোগ উঠেছে, ১২ মার্চের ওই সভায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। আলোচনা হয়েছিল, অধ্যক্ষ শাহজাহানের বেতনভাতা ও স্বপদে বহালের বিষয়ে ঈদের পর সভা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু ১৬ মার্চ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামানকে এক পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেই পৃষ্ঠায় আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও, কী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে, তার কোনো সংযুক্তি তিনি পাননি। 

 

পরবর্তীতে সংযুক্তির জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাননি বলে জানান তিনি। ১২ মার্চ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না হলেও বেআইনিভাবে চিঠি ইস্যু করায় প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদের বিরুদ্ধে ১৩ এপ্রিল মাউশির মহাপরিচালক, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামান।

 

আরও পড়ুন: রংপুরে সিনেমা হলে অসামাজিক কাজ, তরুণ-তরুণীসহ আটক ৩৭

 

এদিকে বুধবার দুপুরে অধ্যক্ষ শাহজাহান সভায় বহালের সিদ্ধান্তের কপি নিয়ে প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে যান। সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন তিনি। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ ডাকেন এবং পুলিশের সহযোগিতায় বিদ্যালয় ছাড়েন।

 

সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামান বলেন, ‘১২ মার্চ আমিসহ ৫ জন শিক্ষক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের কার্যালয়ে যাই। সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়নি। ঈদের পর সভা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে জানিয়ে আমাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়। ১৬ মার্চ একটি চিঠি আসে, যেখানে শুধু লেখা ছিল 'মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে'। সেখানে আদেশ বাস্তবায়নের দুই পৃষ্ঠা সংযুক্তি থাকার কথা বলা হলেও আমরা তা পাইনি। কী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করব, তার জন্য পরবর্তীতে ওই দুই পৃষ্ঠা সংযুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট জায়গায় যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।’

 

একই চিঠির অনুলিপি রংপুর মেট্রোপলিটন হারাগাছ থানার ওসি ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকেও দেয়া হয়। এ বিষয়ে সংযুক্তির দুই পৃষ্ঠার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন বলেন, ‘দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ওনারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। আমি এখনও চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে আমি বলতে পারতাম।’

 

এ বিষয়ে হারাগাছ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অশোক চৌহান বলেন, ‘শাহজাহান আমাকে ফোন করে জানান যে, তিনি হাইকোর্টের একটি আদেশ পেয়েছেন এবং সে অনুযায়ী সেখানে যোগদান করতে যাচ্ছেন। আমি তাকে বলি, হাইকোর্টের আদেশের কপি পেলে তবেই যোগদান করতে। পরে তিনি সেখানে গেলে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে আমিও ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে আলোচনা করে জানতে পারি, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলছেন তিনি এখনও আদেশের মূল কপি পাননি, শুধু একটি কপি দেখানো হয়েছে যেখানে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ আছে। আমি তখন বলি, যথাযথ প্রক্রিয়ায় কাগজপত্র আসার পরই ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ সময় কিছু তরুণ উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়।’

 

আরও পড়ুন: ৫০ বছর ধরে ঘুড়ি বানাচ্ছেন ৯৪ বছরের ‘গুড্ডি দাদু’

 

এ বিষয়ে সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ বলেন, ‘মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী জেলা শিক্ষা অফিসারসহ প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষকবৃন্দকে নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ব্যতীত বাকি সকলেই তার বেতন-ভাতা প্রদান ও তাকে দায়িত্বে রাখার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।’

 

এ বিষয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ শাহজাহান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর কুচক্রী মহলের কারণে আমি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানে আসতে পারিনি। বেতনভাতা ও স্বপদে বহালের জন্য আমি হাইকোর্টে রিট করলে মহামান্য আদালতের আদেশ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের চিঠি নিয়ে যোগদান করতে গেলে বহিরাগতরা ঝামেলা করেন। পরে সেখান থেকে চলে আসি। আমার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন