সংগ্রাম, নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন— কীভাবে নেতৃত্বের শীর্ষে উঠলেন তারেক রহমান

৫ দিন আগে
বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন তারেক রহমান। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে দলের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এতদিন বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্বে ছিলেন সদ্য প্রয়াত সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে থেকে গত ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন বেগম জিয়া। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দলটির সর্বোচ্চ পদে সৃষ্ট হওয়া শূন্যতা দূর করলেন তারেক রহমান।


বেগম খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাগারে বন্দি হওয়ার পর তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। তবুও শুক্রবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়।


তারেক রহমান ১৭ বছরের বেশি সময় লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন, যার মাধ্যমে তাকে ঘিরে তার দলের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া উদ্বেগের অবসান হয়।


আর এর মাধ্যমে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যা-সঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সময়ে পদার্পণ করলো।


তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে করে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।


বিএনপির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় আরও অনেক সামরিক কর্মকর্তার পরিবারের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পরিবারকেও বন্দি করা হয়েছিল। তখন তাদের দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানও বন্দি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর তারা মুক্তি পান। ফলে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ যুদ্ধবন্দিদের একজন ছিলেন।


দলের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমানও তার মায়ের সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের প্রহসনের নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি গৃহবন্দিত্ব এড়িয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন, যেখানে তিনি তুলে ধরেন কীভাবে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অসম ও পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচনের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করেছিল। এর ফলস্বরূপ তার কণ্ঠরোধ করতে স্বৈরশাসক জেনারেল এইচ. এম. এরশাদের সরকার তাকে ও তার মাকে বারবার গৃহবন্দি করে রাখেন।


আরও পড়ুন: তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ


১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক দলে যোগ দেন। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে সংগঠিত করেন এবং এইচ. এম. এরশাদ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।


১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন এবং সেই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়। তার মা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


বগুড়ায় বিএনপির জেলা ইউনিটের নির্বাহী সদস্য হিসেবে তিনি তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির সম্মেলনে তিনি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন আয়োজন করেন, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য জেলা ইউনিটের জন্য একটি আদর্শ মডেল হয়ে ওঠে। বগুড়ার সফল সম্মেলনের পর তিনি অন্যান্য জেলা ইউনিটকেও গণতান্ত্রিকভাবে নেতৃত্ব নির্বাচনে উৎসাহিত করেন।


তবে মূলত, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২ জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।


এরপর ২০০৯ সালে দলের সম্মেলনে তাকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরপরই তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে বিএনপি।


২০০৪ সালে ঢাকায় তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার জন্য তারেক রহমানকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ। পরে আওয়ামী লীগ আমলে এ সংক্রান্ত মামলার আসামিও করা হয়েছিল তারেক রহমানকে, যাতে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পান তিনি।


আরও পড়ুন: নানা পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতদের কথা হয়েছে: হুমায়ুন কবির


বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে তুমুল রাজনৈতিক সংঘাত সহিংসতার জের ধরে বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নিয়েছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।


ওই সময় দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান।


রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনে অভিযোগ তখন বেশ জোরালোভাবে দলের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল। তারেক রহমানের অভিযোগ, গ্রেফতারের পর সেসময় তাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছিল।


পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে পরিবারের সদস্যদেরকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়।

 

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক সহিংসতার জের ধরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

 

ওই সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পর গ্রেফতার হন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বেগম জিয়ার সঙ্গে একই দিনে একইসঙ্গে আটক হয়েছিলেন তার প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমানও। পরে অবশ্য আরাফাত রহমান নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে থাইল্যান্ডে চলে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। পরে তিনি মালয়েশিয়ায় যান এবং সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে।

 

আবার খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের ছয় মাস আগেই গ্রেফতার হয়েছিলেন তারেক রহমানও। পরে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে যাওয়ার পর ২০১৮ সাল পর্যন্ত চিকিৎসা ও পরিবার নিয়েই সময় কাটিয়েছেন তারেক রহমান।

 

এর আগে ২০০৯ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ধীরে ধীরে দলের পুনর্গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকেই দল পরিচালনার কাজ শুরু করেন তিনি। তবে একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজা পাওয়া ছাড়াও অনেক মামলার আসামি হয়েছেন তিনি আওয়ামী লীগ আমলে।

 

এক পর্যায়ে তার বক্তব্য- বিবৃতি প্রচার আদালতের মাধ্যমেই বন্ধ করে দেয়া হলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হন এবং ভার্চুয়ালি দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে থাকেন। তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, অল্প দিনের মধ্যেই একদিকে তৃনমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং অন্যদিকে দলের নীতিনির্ধারণী কাজে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন তিনি।


আরও পড়ুন: বিএনপির চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান

 

বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, তারেক রহমান চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সুসংহত রাখতে পেরেছেন এবং এত সব কিছুর পর দলের নেতা হিসেবে তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা অনেকটা ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো’ বলে মনে করি।

 

‘রাজনীতির যে কানাগলি তা যেমন দেখেছেন, তেমনি এদেশের সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতির একটি অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দলের নেতা থেকে সামনে দেশের নেতা হয়ে উঠতে পারেন কি-না সেটিই হবে এখন দেখার বিষয়,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ।

 

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন অনেকেই মনে করেন। সেই দলটিতে এখন সময়ের পরিক্রমায় এখন তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, তারেক রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে কখনোই ঝড়ঝঞ্জা থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। এমনকি দেশে ফ্যাসিবাদের পতনের পরও তার দেশে ফেরা নিয়ে কুয়াশা তৈরি হয়েছিল। তিনি নিজেই বলেছেন যে সব বাধা অপসারিত হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি তার দলের তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ পেতে সবার সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছেন।

 

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফরে আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে না: সালাহউদ্দিন

 

তারেক রহমানের সঙ্গে গত এক দশক ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, তারেক রহমানের চিন্তা ও দর্শন অনেকটাই জিয়াউর রহমানের মতো।

 

জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘২০০১ সালের পর তিনি তৃণমূলে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তার ভিত্তিতেই তিনি রাজনীতিকে জ্ঞান ভিত্তিক ও উন্নয়ন কেন্দ্রিক করার চিন্তা করেন। দেশের প্রতিটি খাত নিয়ে তিনি ওয়াকিবহাল, আবার আরও জানার আগ্রহও তার আছে। ফলে আমার মনে হয়, দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিএনপি সঠিক নেতৃত্বই পেয়েছে।’

 

১৯৯৪ সালে তারেক রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ডা. জোবাইদা রহমানের সঙ্গে। ডা. জোবাইদা রহমান প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের মেয়ে, যিনি বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং পরবর্তী সরকারগুলোতে দুইবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ডা. জোবাইদা রহমান পেশায় একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছেন। তাদের একমাত্র মেয়ের নাম জাইমা রহমান।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন