শিক্ষা, সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক নরফোক-১৭

৩ দিন আগে

চাকরির সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রের যে শহরে আমার বসবাস তার নাম নরফোক। আটলান্টিকের কোলের কাছে গড়ে ওঠা ভার্জিনিয়া প্রদেশের এই ছোট শহরটি ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষী। শহরের নীতি নির্ধারণী ও কর্মপন্থা নিয়ে কাজ করতে গেলে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, এমনকি ভুল, ভুলের মাশুল, সংগ্রাম, সাফল্য- ব্যর্থতা সবকিছুকেই গুরুত্ব দিয়ে জানা জরুরি। সে রকম একটি জরুরি ইতিহাসের নাম নরফোক-১৭।

১৯৫৪ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রছাত্রীরা শ্বেতাঙ্গদের স্কুলে ভর্তি হতে পারত না। শুধু বর্ণের ভিত্তিতে দুই ধরনের স্কুলব্যবস্থা চালু ছিল। বলা বাহুল্য কৃষ্ণাঙ্গদের বা কালোদের স্কুলের জন্য বরাদ্দ অর্থ ছিল অপ্রতুল এবং ফলস্বরূপ ভালো শিক্ষক, শিক্ষার অন্যান্য উপকরণ—কোনোকিছুই পর্যাপ্ত ছিল না। ১৯৫৪ সালে যুগান্তকারী ‘ব্রাউন বনাম শিক্ষা বোর্ড’ বিধি পাস হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট এই বর্ণবৈষম্যমূলক স্কুলব্যবস্থা বন্ধের পক্ষে রায় দেয়। ফলে কালো শিক্ষার্থীদের জন্য সাদাদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে আইনত আর কোনো বাধা থাকে না।

কিন্তু এর ফলে বিশাল আকারে প্রতিবাদ প্রতিরোধ শুরু হয় বর্ণবাদী সাদাদের দিক থেকে। তারা কোনোভাবেই কালোদের সঙ্গে এক স্কুলে নিজেদের সন্তানদের পাঠাতে রাজি ছিল না। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয়—ভার্জিনিয়ার তৎকালীন গভর্নর থমাস স্ট্যানলি ১৯৫৬ সালে এই বর্ণবাদী মব বা জনতার পক্ষ নিয়ে একটি পরিকল্পনা পাস করেন, যার নাম স্ট্যানলি প্ল্যান। এই প্ল্যানের মূল বার্তা ছিল এই যে—যেসব স্কুল বর্ণবৈষম্যমূলক এই পৃথক্‌করণপ্রক্রিয়া বন্ধের উদ্যোগ নেবে, তাদের জন্য প্রদেশের অর্থ সরবরাহ বন্ধ করা হবে।

তবে সে সময়ের অন্যান্য প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ; যেমন ইউএস সিনেটর হ্যারি বার্ড এবং তৎকালীন নরফোকের মেয়র কেভিন ডাকওয়ার্থ এই পৃথক্‌করণ বন্ধ করতে পাল্টা রাজনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। স্কুল বোর্ড শেষমেশ কোনোভাবেই কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে না পেরে পুরো স্কুল সিস্টেম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫৮ সালে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী ক্লাসরুম থেকে ছিটকে পড়ে। তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত শিক্ষা সম্পন্ন না করেই কর্মক্ষেত্রে ঢুকতে শুরু করে। বাংলা ভাষায় নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার এ এক অনন্য উদাহরণ।

অবশেষে ১৯৫৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই স্কুল বন্ধ করাকে সংবিধানবিরোধী হিসেবে ঘোষণা দেন, এবং এর ফলে স্কুল খুলতে শুরু করে।

ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত; কিন্তু বৈষম্য ও ক্ষমতাশীলের চতুরতা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। নরফোক স্কুল বোর্ড এক নতুন ফন্দি আঁটে। ঘোষণা করে যে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের একটি প্রবেশন পরীক্ষায় পাস করতে হবে। সে সময়ের যেকোনো সাধারণ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ও বুঝতে পারেন যে এটি কেবলই কালো চামড়ার শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করার একটি চেষ্টামাত্র। কালোদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুঁজির অভাব তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম সাদাদের থেকে অনগ্রসর হতে বাধ্য করেছে। দেখতে সাধারণ ও নির্দোষ মনে হলেও এই প্রবেশন পরীক্ষা কালো চামড়ার শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল এক প্রহসনের নাম।

এই প্রহসনের প্রবেশন পরীক্ষা সত্ত্বেও ১৭ জন কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী ১৯৫৯ সালে অবশেষে নরফোক পাবলিক স্কুল সিস্টেম, যা একসময় ছিল কেবলই সাদাদের প্রতিষ্ঠান, তাতে ভর্তির সুযোগ পায়।

এই ১৭ জন শিক্ষার্থী যাদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৬, এরা পরবর্তী সময়ে ভয়ানক রকম অসহযোগিতা, অসম্মান, বুলিং এমনকি হুমকির মধ্য দিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন। এদের অনেকেই সহপাঠীদের থেকে এমনকি শারীরিক আক্রমণের ও শিকার হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানা যায়, তাঁদের প্রায় সবাই এই কঠিন অভিজ্ঞতার ফলে দীর্ঘস্থায়ী গভীর মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন। কিন্তু তাঁরা কেউই কালোদের স্কুলে আর ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। সেই অল্প বয়সে এই নতুন প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়াটা তাদের কাছে ছিল এক মরণপণ যুদ্ধ; যে যুদ্ধে জেতা ছিল তাঁদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ!

এই যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে তারা ভবিষ্যতের অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীর চলার পথকে সহজ করতে পেরেছেন। এই ১৭ জন সাহসী ছেলেমেয়ের কারণেই আজকে নরফোকের প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান আমেরিকান শিক্ষার্থী মর্যাদার সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই বৈষম্য আর সংগ্রামের ইতিহাস আজকের দিনেও এমনকি বাংলাদেশের জন্যও কতখানি প্রাসঙ্গিক, তা না চাইলেও ভাবতে হলো। দাঙ্গাবাজ জনতার অন্যায় দাবি মেনে নেওয়ার বাস্তবতা এখনো আমাদের দেশে প্রাসঙ্গিক। চতুর কথার মারপ্যাঁচে রাজনীতির ফায়দা নিতে বৈষম্য টিকিয়ে রাখার কায়দা এখনো চলমান। তাই জামায়াতের আমির যখন নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে তাঁদের আরাম করার কথা বলেন; তা মূলত ১৯৫৯ সালের প্রবেশন পরীক্ষার মতো। যাতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে ঢুকতে পারা কঠিন হয়ে ওঠে। যদিও তা দিয়ে অনেকের চোখে ধুলা দেওয়ার কাজটা করা যায়।

নীতিনির্ধারণীর ফাঁকফোকর ধরতে পারা এই ২০২৬ সালেও খুব জরুরী কাজ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পৃথীবিতে কোথাও একা একা খুব সহজে ন্যয্যতা প্রতিষ্ঠা পায়নি। অনেকের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর সাহসের বিনিময়ে একেকটা অধিকার অর্জিত হয়েছে। নানারকম ছলছুতোর ফাঁদে পড়ে তা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি।

  • লেখক: ড. আতিয়া ফেরদৌসী, সিনিয়র বাজেট অ্যানালিস্ট, সিটি অব নরফোক, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

সম্পূর্ণ পড়ুন