অনেকের চোখেই এই ঘটনা ক্রীড়াসুলভ নয় এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সৌজন্যের অভাব বলেও মনে হয়েছে, কিন্তু খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই শাবি নিজেকে রেখেছেন বিতর্কের উর্ধ্বে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় প্রকাশিত হয়ে যায়–দলের নিয়ন্ত্রণ কোচের হাতে নেই।
এমন টানটান উত্তেজনায় ঠাঁসা ফাইনালের পর বিতর্ক–শাবি হয়ত মনে করেছিলেন; যথেষ্ট হয়েছে।
গতরাতে (১২ জানুয়ারি) এক ঘোষণায় রিয়াল মাদ্রিদ জানায়, পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ক্লাবের প্রধান কোচের পদ ছেড়েছেন ক্লাবের কিংবদন্তি শাবি। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারই এক সময়ের সতীর্থ আলভারো আরবেলোয়া।
কিন্তু এই পদত্যাগ তার পরিকল্পনায় ছিল না। বেয়ার লেভারকুসেনে ইতিহাস সৃষ্টির পর রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সাত মাসের মাথায় বিদায় নেয়ার কথা শাবির কল্পনাতেও ছিল না। তবে তার বিদায় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
আরও পড়ুন: রোনালদোর গোলের পরও বড় ব্যবধানে হারল আল নাসর
গত কয়েক মাস ধরে কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোচের সঙ্গে একাধিক মতবিরোধের পর, সোমবার (১২ জানুয়ারি) স্পেনের সময় বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বোর্ড একটি বৈঠকে বসে—এজেন্ডায় একটাই বিষয়: শাবি আলোনসোর বিদায়।
বিবিসি জানিয়েছে, শাবি এবং তার ঘনিষ্ঠদের যে ব্যাখ্যাগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো ছিল সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট– ‘তিনি বায়ার লেভারকুজেনে যে ফুটবল খেলিয়ে এতটা সফল হয়েছিলেন, তা এখানে বাস্তবায়ন করতে পারেননি।’ ‘দলের শারীরিক অবস্থা আদর্শ ছিল না।’ ‘খেলোয়াড়দের উন্নতি হয়নি।’ ‘তারা তার জন্য খেলছে বলে মনে হয়নি।’
এই সময়ে দলের হারগুলোর তালিকাও দেওয়া হয়: ক্লাব বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে পিএসজির কাছে হার, লা লিগায় অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের কাছে ৫–২ ব্যবধানে পরাজয়—এমন আরও কিছু। তারপরও, রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বে শীর্ষ আটে আছে—যে প্রতিযোগিতাই তাদের পরিচয় নির্ধারণ করে।
তারা কোপা দেল রের পরের রাউন্ডে উঠেছে এবং লা লিগার অর্ধেক পথ পেরিয়ে বার্সেলোনার থেকে মাত্র চার পয়েন্ট পিছিয়ে আছে। অক্টোবরে এল ক্লাসিকোতে কাতালানদের হারিয়েছেও। এটাকে কি আদৌ সংকট বলা যায়?
সংকট নয় বরং এটি ছিল এই সত্যের প্রমাণ যে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ কখনোই তার কোচের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখেননি। শাবির নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং পেরেজ তাতে সম্মত হয়েছিলেন, কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে নয়। বায়ার লেভারকুজেনেও প্রথম দিন থেকেই সবাই শাবিকে আপন করে নেয়নি।
ফল আসতে শুরু করলে দল তার দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু মাদ্রিদে, মোটামুটি ভালো ফল থাকা সত্ত্বেও, তা কখনোই ঘটেনি। শুরু থেকেই শাবি নিজেকে একা অনুভব করেছেন।
রিয়াল মাদ্রিদে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। কেউই মাদ্রিদকে না বলতে চায় না, এমনকি যারা জানে, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর দাঁড়ানো এক সংস্কৃতিকে আধুনিক, সম্মিলিত ফুটবলে রূপান্তর করা কতটা কঠিন, যেখানে সবাই প্রেস করবে, সবাই ডিফেন্ড করবে। একজন কোচ সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে থাকেন যখন তিনি সদ্য ক্লাবে যোগ দেন, কিন্তু মাদ্রিদ শুরু থেকেই তার কর্তৃত্বে আঘাত হেনেছে।
আরও পড়ুন: ক্লাব ছাড়লেন শাবি, নতুন কোচ নিয়োগ দিলো রিয়াল
শাবি চেয়েছিলেন ক্লাব বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নিতে, তার আগে নয়। টুর্নামেন্টটি হয়েছিল দীর্ঘ এক মৌসুমের পর, যখন খেলোয়াড়রা ছুটির কথা ভাবছিল, আর কেউ কেউ জানত পরের বছর তারা এখানে থাকবে না। এই বিষয়টি নিয়েও তাকে আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি।
সাইনিংগুলোও তেমন সহায়ক হয়নি। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোকে মিডিয়ার একাংশ ‘ল্যামিন ইয়ামালের অ্যান্টি-থিসিস’ হিসেবে তুলে ধরলেও, তার কোনো বাস্তব প্রভাব দেখা যায়নি।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সংকটই পতনের শুরু চিহ্নিত করে। তার ফর্ম পড়ে যায় এবং তিনি নতুন কোচকে দায়ী করতে থাকেন। এরপর এল ক্লাসিকোতে বদলি হওয়ার প্রতিবাদ, তারপর সবার কাছে ক্ষমা চাইলেও কোচের কাছে নয়। এমনকি ভিনির চুক্তি নবায়নের আলোচনা থামিয়ে রাখা হয় এটা দেখতে যে শাবির ভবিষ্যৎ কী হয়!
চোটে জর্জরিত ডিফেন্স, দলবদলে ক্লাব তার মিডফিল্ডার ভেড়ানোর অনুরোধও উপেক্ষা করে (তিনি মার্তিন সুবিমেন্দিকে চেয়েছিলেন)। তদুপরি দলকে একত্রে বাঁধার মতো শক্ত ব্যক্তিত্বের অভাবও ছিল। এমনকি ফেদেরিকো ভালভার্দেকেও দলগত চিন্তার চেয়ে নিজের পজিশন নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন মনে হয়েছেন।
এমবাপ্পে রেকর্ডের পেছনে ছুটেছেন। নিজের সাম্প্রতিক চোট থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠার প্রয়োজনীয়তা মাথায় না রেখে এক পঞ্জিকাবর্ষে রোনালদোর ৫৯ গোলের রেকর্ড ছুঁতে খেলেছেন।
জাবি কখনোই খেলোয়াড়দের বোঝাতে পারেননি যে তার পথটাই সঠিক পথ। আর সেটি না পারায়, তিনি লেভারকুজেনে যে হাই প্রেস, গতি আর পজিশনাল ফুটবল খেলাতেন, তা এখানে চাপিয়ে দিতে পারেননি।

৩ দিন আগে
৩








Bengali (BD) ·
English (US) ·