রাত ৯টা, রফিকের পেট কেমন মোচড়াচ্ছে। সারা দিন কিছুই খায়নি সে। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে খেতে ইচ্ছা করেনি আজ। নতুন একটা গল্প লেখার জন্য প্লট খুঁজছে রফিক, কিন্তু সারা দিনে কয়েক দিস্তা কাগজ আর কলমের কালির অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয়নি। দিন শেষে ঘুমাতে এসে মনে হচ্ছে, বেশ ভালো রকমের ক্ষুধা পেয়েছে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও রান্না ঘরে গিয়ে দুটি পাউরুটি ছাড়া আর কিছুই পেল না। অগত্যা অনেক কষ্টে এই শুকনা পাউরুটি পানিতে চুবিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ল।
নতুন গল্প নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিল খেয়াল নেই। সকালে কলিং বেলের শব্দে লাফ দিয়ে উঠল রফিক। দরজা খুলে দুটি অপরিচিত মুখ দেখে কিছুটা বিরক্ত হলো। যদিও এই এলাকায় রফিকের পরিচিত মুখ বলতে এই বাসার বাড়িওয়ালা চাচা, বাসার দারোয়ান, মোড়ের দোকানি আর টংদোকানের সেলিম ছাড়া আর কেউ নেই। অপরিচিত মুখ দুটি কিছুক্ষণের মধ্যেই জানাল যে তারা স্বামী–স্ত্রী, রফিকের বরাবর ফ্ল্যাটে উঠেছে আজ, তাই দেখা করতে এসেছে। পরিচয়ের পর্ব শেষ করে যাওয়ার সময় হাতে করে যে বাটিটা নিয়ে এসেছিল, সেটা রফিককে দিয়ে গেল। ঢাকনা সরানোর পর আর অপেক্ষা করতে পারল না সে। গপ গপ করে গোটা কয়েক পাটিসাপটা পিঠা খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আবার গল্প লিখতে বসে গেল এই লেখক রফিক।
ভালোই হলো আজ নতুন দুজনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। মনে হচ্ছে, খুবই সজ্জন, আমোদে ধাঁচের মানুষ তারা। যে ১৫ মিনিট কথা হয়েছে তাদের সঙ্গে, তাতে একদম প্রাথমিক কিছু ধারণা পাওয়া গেছে তাদের সম্পর্কে, যেমন নিজেদের বাড়ি কোথায়, বাসায় আর কে কে থাকেন, কে কোন চাকরি করেন এসব। এখন থেকে আর একা একা সারা দিন কাটাতে হবে না। বিকেলে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে ভেবে ভালো লাগছে রফিকের।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]রফিক একা থাকে শুনে নতুন দম্পতি প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু রান্না করা খাবার রফিকের জন্য নিয়ে আসে। ভদ্রমহিলার রান্নার হাত ভালো। রফিককে এই দুই থেকে তিন মাসেই কেমন আপন করে নিয়েছে তারা। আজ অনেক দিন পর দুধ–চা বানাল রফিক। অবশ্য বানাত না, যদি না সামনের ফ্ল্যাটের ভাবি গরম–গরম শিঙাড়া না দিয়ে যেত। শিঙাড়ার সঙ্গে দুধ–চা থাকবে না, তাতো হতেই পারে না। বারান্দায় বসে চা–শিঙাড়া খেতে খেতে রফিক তার পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবছে। এতিমখানায় বড় হয়েছে সে। এমনিতে সবাই অনেক আদর করত, কিন্তু তার কোনো বন্ধু হতো না। কারণ, রফিক কথা বলতে পারত না। একদম পারত না ব্যাপারটা এমন নয়, সে কথা বলার সময় কথা জড়িয়ে যেত, এখনো যায় অবশ্য। এটা নিয়ে সমবয়সী সবাই অনেক মজা করত দেখে একসময় সে কথা বলা একদম কমিয়ে দিয়েছিল। এতিমখানায় তার সময় কাটত কবিতার বই পড়ে। অনেক ছোটবেলা থেকে সে কবিতা লিখে, কিন্তু কারও কাছে সে কবিতা দিয়ে পরিচিত হতে পারেনি। এরপর শুরু করল সমসাময়িক বিষয়ে গল্প লেখা। সেখানেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু সে লেখালেখির পিছু ছাড়েনি। কারণ, তার লিখতে ভালো লাগে, এই লেখালেখি ছাড়া আর কিছুই তেমন পারে না সে। কিন্তু কোনোভাবেই যখন কিছু হচ্ছিল না, তখন অনেক কষ্টে একটা প্রাইভেট কোম্পানির সেলস ডিপার্টমেন্টে চাকরি পেয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছিল, তাতে অবশ্য লাভ হয়নি। অনেকবার সে চাকরি পরিবর্তন করেছে। কোনো চাকরিতেই চার থেকে পাঁচ মাসের বেশি মনোযোগ ধরে রেখে কাজ করতে পারত না। ফলাফল হিসেবে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিত তাকে। এভাবে প্রায় কয়েক বছর সে বিভিন্ন জায়গায় যাযাবরের মতো চাকরি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবার লেখালেখিতে ফেরত এল। এবার সাইকো–থ্রিলারকে সাবজেক্ট হিসেবে নিয়ে লেখালেখি করে সে এখন পর্যন্ত দুটি বইও প্রকাশ করেছে। লেখকপাড়ায় রফিক এখন কিছুটা পরিচিত মুখ। এতিমখানার দেওয়া নাম ‘রফিক মিয়া’ নামটি একজন লেখকের সঙ্গে যাচ্ছিল না দেখে লেখক রফিকের নতুন নাম হলো ‘রফিকুজ্জামান রফিক’। আশাতীতভাবে তার লেখা দুটি বইয়েরই হাজারখানেক কপি বিক্রি হয়েছে, যা ধারণার বাইরে ছিল। দ্বিতীয় বই প্রকাশের পর প্রায় এক বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে কিছুতেই নতুন গল্প শুরু করতে পারছিল না রফিক। এই কয় মাসে নতুন গল্প নিয়ে বেশ কিছুদূর সে এগিয়েছে। এতে রফিক অনেক খুশি। চায়ে চুমুক দিয়ে কেন যেন তার মনে হচ্ছে, খুব শিগগির গল্পটা শেষ করতে পারবে।
ভালোবাসা তখন-এখনইদানীং পাশের ফ্ল্যাটের ভাই–ভাবি আর আসে না। হঠাৎ কী হলো কে জানে! অবশ্য তাতে তার কিছু আসে–যায় না। সে একা থেকে অভ্যস্ত। মাঝেমধ্যে এই একাকিত্ব তার ভালো লাগে, কিন্তু সব সময় নয়। গত কয়েক দিন সে টানা লিখেই চলেছে। প্রায় পাঁচ দিন পর গল্পটা শেষ করে ঘর থেকে বের হলো রফিক। এলাকার টংদোকানে চা খেতে গিয়ে একটা খারাপ খবর শুনে রফিকের মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল। টংদোকানের সেলিম আফসোস করে বলছিল, ‘ভাইজান খবর শুনছেন! আপনের বিল্ডিংয়েরই তো ঘটনা। জামাই–বউ দুজনরেই এমন অদ্ভুতভাবে কেডায় জানি মারল! পুলিশ কয় ডাকাইত। কিন্তু ডাকাইত তো আর মারবার পরে গতরের চামড়া ছিলাই চামড়ার নিচে লবণ দিয়া রাখব না। আপনেই কন! অবশ্য ডাক্তারসাব কইছে, মারার আগেই চামড়া ছিলাই লবণ লাগাইছে। কী ভয়ানক মরণ যন্ত্রণা দিয়া মারছে তারারে, একবার চিন্তা করেন। আপনে কি পত্রিকাও পড়েন নাই! আইজকার পত্রিকাতে খবর ছাপছে তো। এমন কাম কোনোভাবেই কোনো সাধারণ মাইনষের না। অহন তো আপনার বিল্ডিংয়ের বাড়িওয়ালা চাচায় খাইছে কেস। আমি তো তেনারে আগেই কইছিলাম যে ভালা মতন খোঁজখবর না লইয়া বাড়িভাড়া দিয়েন না। কই থেইক্কা না কই থেইক্কা কি কাম কইরা আসছে, এখন মারা পড়ল।’
আমি কিছু চৈত্র দিন কিনতে চাইখবরটা শুনে আর দোকানে বসে থাকতে ভালো লাগছে না রফিকের। পাশের ফ্ল্যাটের ভাই–ভাবির জন্য মায়া লাগছে। যারা কিছুদিন পর মারা যাবে, তাদের সঙ্গে শুধু শুধু মায়ায় জড়ানো ঠিক হয়নি। এর চেয়ে মায়ার অভিনয় করাই ভালো ছিল। না, আর কখনো যাদের নিয়ে বই লিখবে, তাদের সঙ্গে মায়ায় জড়াবে না সে। মায়ায় জড়ালে গল্পের শেষটা লিখতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। কারণ, তাদের মেরে ফেলতে গেলে কেমন একটা কষ্ট লাগা কাজ করে। দোকান থেকে বের হয়ে বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে দুই রাত আগের ঘটনা মনে পড়ল তার। ভাই–ভাবির শেষের দিকে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। এতক্ষণ মন খারাপ লাগলেও এখন তাদের কষ্টমাখা চেহারাটার কথা ভাবতেই রফিকের মনের ভেতরে আনন্দ দোল দিয়ে গেল। ঠোঁটের কোনায় একটা স্মিতহাসি ফুটে উঠেছে। সে কত অসাধারণ, কেউ সেটা জানে না। হয়তো কখনো জানবেও না।
*লেখক: নুসরাত আহমেদ আশা, সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ইঞ্জিনিয়ার, কার্ল জাইস ডিজিটাল ইনোভেশন জিএমবিএইচ, মিউনিখ, জার্মানি








Bengali (BD) ·
English (US) ·