ট্রাম্প কয়েকদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে। তবে ইরান বারবার বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না। এমনকি ইরানের নেতারা বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছে।’
পরমাণু ইস্যুতে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে—জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শিশুই প্রায় ৩০০ জন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব হাতে পাওয়ার কথা জানালো ইরান
হামলা শুরুর কয়েকদিন পর ইরানের সামরিক বাহিনীর বিশেষ শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়ে জানায়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকবে। পরে সীমিত আকারে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের কিছু জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়।
এর সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলার কারণে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যেখানে যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার।
তবে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনার খবর প্রকাশ হওয়ার পর শেয়ারবাজার কিছুটা বেড়েছে এবং তেলের দাম সামান্য কমেছে। তারপরও বিশ্লেষকরা বলছেন, আদৌ কোনো বাস্তব আলোচনা হচ্ছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। আর যদি আলোচনা হয়ও দুই পক্ষের দাবির মধ্যে বড় পার্থক্য থাকায় সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবে কী আছে?
আল জাজিরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে পাকিস্তানের মাধ্যমে। এই পরিকল্পনায় এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব রয়েছে, যাতে দুই পক্ষ বসে যুদ্ধ শেষ করার শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
আল জাজিরার জন হেনড্রেন ওয়াশিংটন ডিসি থেকে জানিয়েছেন, পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্ক চেষ্টা করছে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বৈঠক আয়োজন করতে। বৃহস্পতিবারের মধ্যেই এমন বৈঠক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত হচ্ছে—যেমন মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন থেকে প্রায় ৩ হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা।
তবে এই ১৫ দফা পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নিশ্চিত করেনি—না যুক্তরাষ্ট্র, না ইরান, না ইসরাইল, না মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। কিন্তু ইসরাইলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে পরিকল্পনার সম্ভাব্য কিছু মূল দিক তুলে ধরা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন সেনারা নেতানিয়াহুর বিভ্রমের শিকার হবে: ইরানের স্পিকার
প্রধান বিষয়গুলো হলো-
১. ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি
২. নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা
৩. ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন স্থায়ী অঙ্গীকার
৪. সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার কাছে হস্তান্তর এবং ভবিষ্যতে পূর্ণ নজরদারির অনুমতি
৫. দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা
৬. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লায় সীমা আনা
৭. আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করা
৮. জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করা
৯. হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া
১০. ইরানের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং জাতিসংঘের পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থাও বন্ধ করা
১১. বুশেহরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা
ইসরাইল এই আলোচনা কতটা সমর্থন করছে, তা স্পষ্ট নয়। আল জাজিরার নিদা ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ‘পর্দার আড়ালে’ ইসরাইল এই ১৫ দফার সঙ্গে অনেকটাই একমত। কিন্তু তারা চিন্তিত—ট্রাম্প চুক্তি করতে গিয়ে কতটা ছাড় দেবেন।
যুদ্ধের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো যেভাবে বদলেছে
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দাবি অপ্রকাশিত হলেও মূলভাব অনেকটাই একই রয়েছে, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। এগুলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত হতো, যা তাত্ত্বিকভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।
২০১৫ সালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অব অ্যাকশন–এর আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখার অঙ্গীকার করে এবং এটা নিয়মিত তত্ত্বাবধানে ছিল। তবে ট্রাম্প ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে একপক্ষীয়ভাবে চুক্তিটি থেকে বের করে নেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিলো পাকিস্তান
বর্তমানে ১৫ দফা পরিকল্পনায় বুশেহর–এর জন্য সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। জায়গাটি তেহরান থেকে প্রায় ৭৫০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত এবং ইরানের একমাত্র বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি রাশিয়ায় উৎপাদিত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে চালানো হয়।
যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে মূলত পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর মনোযোগ ছিল, কিন্তু চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি চলমান যুদ্ধে প্রথম দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এক সপ্তাহ পর তার দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন, যা ওয়াশিংটনের পছন্দ হয়নি।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত হওয়ার পর, ট্রাম্পিএনবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমি মনে করি তারা বড় ভুল করেছে। আমি জানি না, তিনি টিকবেন কি না। আমার মনে হয় তারা ভুল করেছে।’ তবে রিপোর্ট করা ১৫ দফা পরিকল্পনায় শাসন বা সরকার পরিবর্তনের কোনো কথা উল্লেখ নেই।
ইরান যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে
ইরান স্পষ্ট করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসতে পারবে না, কারণ গত দুই বছরে চলমান আলোচনার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর দুটি হামলা চালিয়েছে।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি আজ বুধবার (২৫ মার্চ) রাষ্ট্রীয় টিভিতে ট্রাম্পকে বিদ্রূপ করে বলেন, ‘আপনার মানসিক রোগ কি এতটাই বেড়ে গেছে যে, আপনি নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মতো মানুষ কখনও আপনার মতো মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে পারবে না।’
ইরান আরও পুনর্ব্যক্ত করেছে, ‘যেমন আমরা সব সময় বলেছি… আমাদের মতো কেউ আপনার সঙ্গে চুক্তি করবে না। এখন নয়, ভবিষ্যতেও নয়।’ এদিকে ইরান ও ইসরাইল আবারও একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ অবসানে ইরানের দাবিগুলো কী?
যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের কিছু শর্ত রয়েছে, যদিও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় না। গত ১১ মার্চ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ শেষ করার শর্তাবলী প্রকাশ করেন। এক্স-এ এক পোস্টে তিনি জানান, তিনি রাশিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ‘ইরানের শান্তির প্রতি অঙ্গীকার’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পেজেশকিয়ান আরও লেখেন: ‘জায়োনিস্ট প্রশাসন (ইসরাইল) ও যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা প্ররোচিত এই যুদ্ধ শেষ করার একমাত্র উপায় হলো ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকৃতি দেয়া, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে আক্রমণ রোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা।’
এছাড়া ইরান চায় যে তার ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হোক। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির উদ্ধৃতি অনুযায়ী, তেহরান চাইছে উপসাগরীয় অঞ্চলে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা হোক এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন একটি আইনি ব্যবস্থাও তৈরি হোক, যা প্রাথমিকভাবে ইরানের আধিপত্যকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে।
আলোচনা কি হবে, হলে তার মূল বিষয়বস্তু কী হবে?
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, সীমিত মাত্রায় হলেও ইরান আলোচনা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘পূর্ণ আলোচনার’ পরিবর্তে কিছু ‘যোগাযোগ’ হয়েছে। একই সূত্র বলেছে, ইরান এমন প্রস্তাব শুনতে প্রস্তুত যা ‘দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই’ হবে এবং যুদ্ধে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে।
ইরান প্রস্তুত সব ধরনের নিশ্চয়তা দিতে যে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, কিন্তু শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার অধিকার তার রয়েছে। সঙ্গে অবশ্যই ইরানের ওপর থাকা সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আলোচনার সম্ভাবনা আছে কারণ প্রেসার বাড়ছে। ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে যুদ্ধ অবসানের জন্য, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি দাম ও শেয়ারবাজারের ওপর প্রভাব পড়েছে।
আরও পড়ুন: যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার আয়োজন করতে চায় পাকিস্তান: শেহবাজ
ভোটারদের চাপও আছে, যেহেতু নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে সাধারণ জনগণকে সন্তুষ্ট করতে হবে। অধিকাংশ আমেরিকান যুদ্ধ সমর্থন করছেন না। ইরানও আঞ্চলিক হামলা ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ক্ষতি বন্ধ করতে প্রতিবেশী দেশগুলোর চাপের মুখে রয়েছে।
ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘কয়েকটি কারণে আলোচনার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ।’ তিনি বলেন, যুদ্ধের খরচ সব পক্ষের জন্য উচ্চ এবং কিছু মধ্যস্থতাকারী দেশ যেমন মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, যা আলোচনার পথ প্রশস্ত করছে।
হাবিবি যোগ করেন, ‘ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল, দ্রুত যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইরানের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এখন তারা তাদের প্রত্যাশা পুনর্মূল্যায়ন করছে এবং বুঝছে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে খরচ অনেক বেশি এবং ইরান ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম।’
]]>
৪ সপ্তাহ আগে
৫








Bengali (BD) ·
English (US) ·