তুরস্কের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে জন্ম নিয়ে পাশাপাশি বয়ে চলা এই দুই নদীকে ইরাকের প্রাণভোমরা বললেও অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু এক সময় প্রাচুর্যের প্রতীক এই দুই নদী আজ মৃতপ্রায়। যাদেরকে বাঁচাতে এখন এক কঠিন সিদ্ধান্ত বেছে নিচ্ছে ইরাক। পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে নিজেদের সবচেয়ে দামি সম্পদ তেল দিয়ে দিতে হচ্ছে দেশটিকে।
৪ কোটি ৬০ লাখের বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে পানি সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে তুরস্ক, ইরান ও সিরিয়ায় নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ অন্যতম। এছাড়া কয়েক দশকের যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা আর অস্থিতিশীলতার কারণে ইরাকের পানি অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে সরকারি অব্যবস্থাপনাও।
এর ওপর আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এর ফলে প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছে ইরাক। একদিকে পানি কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে চাহিদা। শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে। আবার দেশটির মোট পানির ৮০ শতাংশই খরচ হয় কৃষিকাজে, ফলে কৃষিখাতটিও এখন হুমকির মুখে।
ইরাকের পানির উৎসের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক থেকে। তবে উজানে বাঁধ নির্মাণের কারণে আগের চেয়ে অনেক কম পানি পাচ্ছে দেশটি। এই সংকট কাটাতে আঙ্কারার সঙ্গে বিতর্কিত একটি চুক্তি করেছে বাগদাদ। এই চুক্তির মূল বিষয় হলো—ইরাকের তেলের বিনিময়ে দেশটির পানি অবকাঠামো উন্নয়ন করে দেবে তুরস্ক।
আরও পড়ুন: শুকিয়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ইরাকের টাইগ্রিস নদী
চলতি বছরের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকশ’ কোটি ডলার মূল্যের ‘ওয়াটার কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট’ চূড়ান্ত হয়। এই চুক্তির আওতায় তুর্কি কোম্পানিগুলো ইরাকের পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করবে। বিষয়টিকে অনেকটা ‘তেলের বিনিময়ে পানির নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর পানি বিষয়ক উপদেষ্টা তুরহান আল-মুফতি জানান, চুক্তি অনুযায়ী ইরাক প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বিক্রি করবে। সেই অর্থ একটি তহবিলে জমা হবে, যা দিয়ে পানি অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ করা তুর্কি কোম্পানিগুলোকে অর্থ পরিশোধ করা হবে। প্রাথমিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পানি ধরে রাখার বাঁধ নির্মাণ ও ভূমি পুনরুদ্ধার।
আঙ্কারা বিষয়টিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছে। বাগদাদে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘তুরস্ক ইরাকের নিরাপত্তা ও উন্নয়নে সহায়তা করতে আগ্রহী। এ বিষয়ে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’
ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হোসেন এই চুক্তিকে দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে বর্ণনা করেছেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দজলা ও ফোরাত নদীর পানি বণ্টন নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকায় বাগদাদ দীর্ঘদিন ধরে অসহায় ছিল।
ইরাক সরকারের পানি বিষয়ক উপদেষ্টা আল-মুফতি বলেন, ‘এই প্রথমবারের মতো দজলা ও ফোরাতের পানির স্থায়িত্ব নিয়ে একটি স্পষ্ট ও বাধ্যবাধকতামূলক ব্যবস্থা তৈরি হলো।’ তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে কৃষি, শিল্প ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ইরাকে পানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় রাখতে দুই পক্ষই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আরও পড়ুন: আজও বায়ুদূষণের শীর্ষে দিল্লি, ঢাকার অবস্থান কত
তবে এই চুক্তি নিয়ে ইরাকের রাজনীতিবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শঙ্কা ও অবিশ্বাসও রয়েছে। বাগদাদভিত্তিক পানি নীতি বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ শুরকি আলাবায়াচি বলেন, ‘পানি মানুষের মানবাধিকার। একে তেলের আয়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পণ্যে পরিণত করা উচিত নয়।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, তুরস্কের সঙ্গে এই চুক্তি আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতির স্বীকৃত নীতির পরিপন্থী।
তার মতে, এটি ইরাকের পানি সংকটের কোনো সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী, সার্বভৌম ও পেশাদার পানিনীতি এবং কৃষিখাতের সংস্কার। ইরাকি গ্রিন ক্লাইমেট অর্গানাইজেশনের প্রধান ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মুখতার খামিস বলেন, তুরস্ক দজলা ও ফোরাত নদীর উজানে যেসব বাঁধ দিয়েছে, তা ইরাকে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। এতে ইরাকের চলমান পানি সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
]]>
৩ সপ্তাহ আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·