ভারতের তীব্র সমলোচনায় উইজডেন

১ সপ্তাহে আগে
বিশ্ব ক্রিকেটের প্রশাসনিক কাঠামোয় ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে উইজডেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ‘অরওয়েলীয়’ রূপ নিচ্ছে— অরওয়েলীয় কথাটার উৎস ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল-এর চিন্তাধারা ও লেখালেখি থেকে। সহজ ভাষায় ‘অরওয়েলীয়’ বলতে বোঝানো হয় এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ক্ষমতার প্রভাবে সত্যকে বিকৃত করা হয়— ভাষা ও তথ্যকে ব্যবহার করা হয় বিভ্রান্তির হাতিয়ার হিসেবে, আর কথার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক ক্রমশ বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক উইজডেন ১৮৬৪ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে এবং সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সংকলন। খেলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-পরিসংখ্যানের ভাণ্ডার হওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সম্পাদকীয় অবস্থানের কারণেই এটি আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। সঙ্গত কারণেই একে প্রায়শই ‘ক্রিকেটের বাইবেল’ বলা হয়। 

 

কাল প্রকাশিত হতে যাওয়া ১৬৩তম সংস্করণেও সেই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে। ‘নোটস ফ্রম দ্য এডিটর’ শিরোনামের লেখায় সম্পাদক লরেন্স বুথ বৈশ্বিক ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব নিয়ে সরব হয়েছেন। তার মতে, এই প্রভাব ক্রমেই অস্বাস্থ্যকর ও রাজনৈতিক মাত্রা পাচ্ছে— যা নিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

 

বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর শীর্ষ নেতৃত্বেও রয়েছে ভারতীয় প্রভাব। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী সংযোগ গুপ্ত এবং চেয়ারম্যান জয় শাহ— দুজনই ভারত থেকে উঠে আসা। জয় শাহ আবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও পরিচিত। 

 

আরও পড়ুন: পিএসএল ছেড়ে আইপিএলে যোগ দেওয়ায় শাস্তি পেলেন মুজারাবানি

 

এ প্রেক্ষাপটে উেইজডেন ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই-কে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছে। তাদের বর্ণনায়, বিসিসিআই যেন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের ক্রীড়াঙ্গনে কার্যকর এক সহযোগী শক্তি— যে সংস্থার নেতৃত্বে অতীতে ছিলেন জয় শাহ নিজেই। 

 

সম্পাদক লরেন্স বুথ-এর লেখায় স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে ২০২৫ সালের এশিয়া কাপের কথা, যেখানে ক্রিকেটের চেয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই বেশি আলোচনায় ছিল। ভারত-পাকিস্তানের স্বল্পমেয়াদি সামরিক উত্তেজনার আবহে আয়োজিত সেই টুর্নামেন্টে মাঠের আচরণও বিতর্ক উসকে দেয়। টসের সময় ভারতীয় অধিনায়ক পাকিস্তানের অধিনায়কের সঙ্গে করমর্দন এড়িয়ে যান, এমনকি ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও প্রচলিত সৌজন্য বিনিময় দেখা যায়নি। 

 

বুথ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘২০২৫ সালে খেলাটির পরিচালনাব্যবস্থা নিয়ে এর চেয়ে বড় অভিযোগ আর কী হতে পারে, যখন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি বললেন, “রাজনীতি ও খেলাধুলা একসঙ্গে চলতে পারে না।” সম্ভবত তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, তিনি নিজ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও।’ 

 

আরও পড়ুন: উইজডেনের বর্ষসেরা স্টার্ক ও দীপ্তি

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন,  ‘এই সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব পাকিস্তানের বিপক্ষে এশিয়া কাপের প্রথম জয়ের পর সেটি সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসর্গ করেন। এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, খেলার মাঠে অপারেশন সিঁদুর। ফল একই— ভারতের জয়! বাস্তবের অপারেশন সিঁদুর-এ সীমান্তের দুই পাশে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।’ 

 

লরেন্স বুথ-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনাও। তার মতে, মোস্তাফিজকে আইপিএলের প্রায় ১০ লাখ ডলারের চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এর রেশ গিয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও— বাংলাদেশ দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি, কারণ দেশটির সরকার দলকে ভারত সফরের অনুমতি দেয়নি। বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। 

 

এই প্রেক্ষাপট টেনে বুথ মন্তব্য করেন, ক্রিকেটের প্রশাসনিক কাঠামো ক্রমশ ‘অরওয়েলীয়’ রূপ নিচ্ছে— যেখানে ভারতের জন্য আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হলেও সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়। তিনি লিখেছেন, ‘ক্রিকেটের শাসনব্যবস্থা ক্রমেই অরওয়েলীয় হয়ে উঠছে, যেখানে এমন ভান করা হচ্ছে যে ভারতের জন্য আলাদা নিয়ম হলেও তাতে কিছু আসে যায় না এবং এ নিয়ে ক্ষোভ জানালে উল্টো দোষী বানানো হচ্ছে নিচের স্তরের দলগুলোকে। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় ক্রিকেট অঙ্গনের প্রায় কোনো প্রভাবশালী কণ্ঠই এই নৈরাজ্যের মূল কারণ নিয়ে কথা বলেনি— একটি খেলার রাজনীতিকরণ, মহসিন নাকভি যা–ই বলুন না কেন, কখনোই বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না, তবে তা এতটা বিষাক্তও কখনো হয়নি।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন