পরবর্তীতে আপসহীন নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সান্নিধ্য পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯৬ সালে চাকরি ছেড়ে আহ্বায়ক হিসেবে কক্সবাজার জেলা বিএনপির হাল ধরেন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম, ১৯৯৬ সালের জুনে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালের অক্টোবরে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতি, আন্দোলন সংগ্রামের দীর্ঘপথ এবং নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথবাক্য পাঠ করেন। সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন মন্ত্রীদের দফতর বণ্টন ও আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন।
এর আগে সকালে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ।
১৯৯৬ সালে (ষষ্ঠ) প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াত ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুখকে ৯৫ হাজার ৮৩০ ভোটের বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। দেশের পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা কক্সবাজারের দুই উপজেলা চকরিয়া ও পেকুয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ থেকে তিনি এর আগে ১৯৯৬ (সপ্তম) ও ২০০১ সালেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন হলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সেই সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনিই প্রথম কক্সবাজার জেলা থেকে প্রতিমন্ত্রীত্ব পান।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের তৎকালীন চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হকের পরিবারে সালাহউদ্দিন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। আনুষ্ঠানিক শপথের মাধ্যমে তিনিই হবেন মুক্তিযুদ্ধের পর কক্সবাজার থেকে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী।
আরও পড়ুন: নির্যাতন-নির্বাসনের দুঃসহ স্মৃতি মাড়িয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় তারেক রহমান
সালাহউদ্দিনের সংগ্রাম-সাফল্য
১৯৭৭ সালে পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন সালাহউদ্দিন আহমদ। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালের এইচএসসিতেও দারুণ ফলাফল করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এবং কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতিও ছিলেন।
১৯৮৫ সালের ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় (প্রশাসন) উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে বদলি হয়ে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে তিনি নিযুক্ত হন।
পরবর্তীতে আপসহীন নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সান্নিধ্য পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯৬ সালে চাকরি ছেড়ে আহবায়ক হিসেবে কক্সবাজার জেলা বিএনপির হাল ধরেন এবং একই বছরে পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
কাউন্সিলে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে পরপর দুইবার কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি দায়িত্ব পালন করা সালাহউদ্দিন আহমদ ২০১০ সালে বিএনপি’র জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্মমহাসচিব মনোনীত হয়েছিলেন।
২০১৫ সালে দেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ঐ বছরের ১০ মার্চ গুমের শিকার হন সালাহউদ্দিন আহমদ, দীর্ঘ ৬২ দিন পর ১১ মে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের শিলংয়ে তার খোঁজ পাওয়া যায়। ভারতের শিলং থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
শিলংয়ের কারাগারে বন্দি জীবন, নির্বাসনে থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ১০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিজ মাতৃভূমিতে সালাহউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় নিজের শেষ নির্বাচনি সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, আমার বেঁচে থাকার কথা ছিল না, আমাকে গুম করা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশে। আপনারা দোয়া করেছেন, রাব্বুল আলামিন আপনাদের মোনাজাত শুনেছেন এবং আমাকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমার এই নতুন জীবন, এই বর্ধিত হায়াত এ দেশের মানুষের সেবা করার জন্য। আমার জন্ম হয়েছে এ দেশের উন্নয়নের জন্য, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না বলেন, কক্সবাজারবাসীর প্রিয় নেতা সালাউদ্দিন আহমদ পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব¡ পাওয়ায় আমরা কক্সবাজারবাসী অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। আমাদের জেলার একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতার হাতে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বড় অর্জন। আমরা তাঁর প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তাঁর নেতৃত্বে দেশ ও জনগণ আরও বেশি নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তিনি আর বলেন, 'একইসঙ্গে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং সংসদের উপনেতা হিসেবে শপথ গ্রহণ করায় আমরা গভীরভাবে আনন্দিত। এটি বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বাংলাদেশের নতুন এই অগ্রযাত্রায় আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশ ও জনগণের কল্যাণে এই নতুন অধ্যায় সফল হোক-এই কামনা করি।'
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত বিপু বলেন, পুরো জেলাবাসীর জন্য আজকে গৌরবের দিন, আমরা একজন যোগ্য মানুষকে মন্ত্রী হিসেবে পেতে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ পুরো দেশের সাথে সালাহউদ্দিন আহমদের যোগ্য নেতৃত্বে আরো সমৃদ্ধ হবে আমাদের কক্সবাজার।
উল্লেখ্য, ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২ সপ্তাহ আগে
৩








Bengali (BD) ·
English (US) ·