বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগিয়েছে লন্ডন ও ফ্রাঙ্কফুর্টের সড়কে রমজানের রোশনাই (ছবি ও ভিডিও)

১৮ ঘন্টা আগে

ইউরোপের দুই গুরুত্বপূর্ণ নগরী লন্ডন ও ফ্র্যাঙ্কফুর্ট সেজেছে ‘রামাদান লাইটস’-এর সজ্জায়। এই রমজানের রোশনাই এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায়।

রমজান মানেই সংযম, আত্মশুদ্ধি আর ইবাদতের মাস। কিন্তু বিশ্বের কিছু শহরে এই পবিত্র মাস এখন আলো ও রঙের এক নান্দনিক উৎসবেও রূপ নিয়েছে। ইউরোপের দুই গুরুত্বপূর্ণ নগরী লন্ডন ও ফ্র্যাঙ্কফুর্ট সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘রামাদান লাইটস’ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন এক ইতিহাস গড়েছে। এটি শুধু সাজসজ্জা নয়, বরং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল প্রতীক। বিশ্বজুড়েই এখন আলোচনায় এই দুই নগরীর রমজানের রোশনাই।

লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ড

বিশ্বের বহু দেশে যুগ যুগ ধরেই ক্রিসমাস লাইটস দিয়ে সড়ক সাজানোর প্রচলন আছে বড়দিনের সময়। কিন্তু ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্ট এন্ডে ঝলমলে 'রামাদান মুবারাক' লেখা লাইটের আলোকসজ্জা টাঙানো হয়। অক্সফোর্ড স্ট্রিট ও পিকাডিলি সার্কাসের মতো ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় ঝুলে থাকা চাঁদ-তারার নকশা ও আরবি ক্যালিগ্রাফি এক নতুন বার্তা দেয়। আর তা হলো, রমজান এখন শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়, বরং পুরো শহরের আনন্দের অংশ।

লন্ডনে প্রায় ১৩ লাখের বেশি মুসলিম বাস করেন। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে ক্রিসমাস, দীপাবলি বা চায়নিজ নিউ ইয়ারের মতো উৎসব আলোকসজ্জায় উদযাপিত হয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় রমজান লাইটস যুক্ত হওয়াকে অনেকেই দেখছেন ব্রিটেনের ইনক্লুসিভ সংস্কৃতির স্বীকৃতি হিসেবে। এই আয়োজনের পেছনে ছিল স্থানীয় মুসলিম উদ্যোক্তা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগ, সঙ্গে ছিল সিটি অব ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিলের সহযোগিতা।

রাতে যখন আলো জ্বলে ওঠে, তখন মুসলিম পরিবারগুলোর পাশাপাশি নানা ধর্ম–বর্ণের মানুষ ছবি তুলতে ভিড় করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে রমজানের রোশনাই। রোজার মাসে ইফতারের সময়ের আগে–পরে এই এলাকা যেন হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা।

ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

জার্মানির আর্থিক রাজধানী ফ্র্যাঙ্কফুর্ট ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে রামাদান লাইটস চালু করে। শহরের কেন্দ্রস্থল জাইল শপিং স্ট্রিটে ঝুলানো হয় আলোকিত হ্যাপি রামাদান বার্তা। জার্মানিতে প্রায় ৫০ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যাদের বড় অংশই তুর্কি বংশোদ্ভূত।

ফ্র্যাঙ্কফুর্ট সিটি কাউন্সিলের এই উদ্যোগ ছিল এক প্রতীকী পদক্ষেপ; ইসলাম যে জার্মান সমাজের অংশ, তা দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরার চেষ্টা। তবে এটি নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কেউ কেউ এটিকে সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন, আবার সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন রাষ্ট্রীয় পরিসরে ধর্মীয় প্রতীকের উপস্থিতি নিয়ে।তবুও আলো জ্বলে ওঠার মুহূর্তে শহরের মুসলিম তরুণ–তরুণীদের চোখে ছিল উচ্ছ্বাস। তাদের কাছে এটি ছিল স্বীকৃতির এক দৃশ্যমান চিহ্ন—“আমরাও এই শহরের অংশ।”

আলোর ভাষায় সহাবস্থান

লন্ডন ও ফ্র্যাঙ্কফুর্টের রামাদান লাইটস কেবল সৌন্দর্যের আয়োজন নয়; এটি সামাজিক বার্তা বহন করে। ইউরোপে মুসলিম সম্প্রদায় নিয়ে নানা বিতর্ক, অভিবাসন–রাজনীতি ও পরিচয়ের প্রশ্নের ভেতর এই আলোকসজ্জা এক ধরনের সংলাপ তৈরি করেছে।

রমজানের এই রোশনাই দেখিয়ে দেয়, ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিলে শহর আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। একই রাস্তায় ক্রিসমাসের ঝলক, দীপাবলির দীপ আর রমজানের চাঁদ–তারা লাইট এই সব মিলিয়ে আধুনিক ইউরোপের বহুজাতিক বাস্তবতা ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাবনা

ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরে রমজান মানেই ব্যস্ত বাজার, ইফতারের সুবাস আর মসজিদমুখী জনতা।পরিকল্পিত আলোকসজ্জার মাধ্যমে শহরজুড়ে রমজানের নান্দনিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। তবে বিপণিবিতানগুলো এ সময় সেজে ওঠে বর্ণিল আলোকসজ্জায়। অনেক সময় লোডশেডিং আর বিদ্যুতসংকটের সময় তা বাহুল্য বা সোজাসুজি বলতে গেলে অপচয় মনে হয়। তারপরেও ঝিলমিলে আলোকসজ্জা আমাদেরকে মুগ্ধ করে।

আবার ইউরোপে ফিরে যাই। সেখানে নানা বৈষম্য ও প্রতিকূলতার মাঝে এই রমজানের রোশনাই শুধু রাস্তাঘাট আলোকিত করে না; এটি হৃদয়ের অন্ধকারও দূর করার আহ্বান জানায়। লন্ডন ও ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ‘রামাদান লাইটস’ প্রমাণ করে, বৈচিত্র্যের মাঝেই ঐক্য সম্ভব। আলোর এই ভাষা হয়তো ভবিষ্যতে এই নগরীগুলোকে আরও সহনশীল ও মানবিক করে তুলবে।

সূত্র ও ছবি: ইন্সটাগ্রাম

সম্পূর্ণ পড়ুন