বিল গেটস কেন মোদির এআই সামিট থেকে বেরিয়ে গেলেন

২ সপ্তাহ আগে
মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ভারত সরকারের আয়োজিত এআই সামিট থেকে হঠাৎ বাকি মূল বক্তৃতা বাতিল করেছেন। ভারতের নয়াদিল্লিতে চলমান এআই সামিটের মঞ্চে বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) তার বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল।

অতীতে কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক প্রয়াত জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে গেটসের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সামিটের মূল গুরুত্ব ও লক্ষ্য বজায় রাখতে তার উপস্থিত না থাকা শ্রেয়। গেটস ফাউন্ডেশন জানায়, তার উদ্দেশ্য ‘এআই সামিটের মূল অগ্রাধিকারগুলোতে মনোযোগ বজায় রাখা’।

 

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’ নামে এআই সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। এই সম্মেলনে ২০টির বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং ১০০ জন সিইও ও প্রতিষ্ঠাতাসহ বিশ্বের ৫০০ জনের বেশি এআই বিশেষজ্ঞ অংশ নিয়েছেন।

 

গত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) শুরু হয় এআই বিষয়ক চতুর্থ বার্ষিক আন্তর্জাতিক এ আয়োজন। এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য, ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ২০২৫ সালে ফ্রান্সে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

 

আরও পড়ুন: ব্রিটিশ রাজা চার্লসের ছোট ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু গ্রেফতার

 

পাঁচ দিনব্যাপী এই সামিটকে ভারতের এআই খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রদর্শনের বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী দুই বছরে দেশটি ২০০ বিলিয়নের বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আশা করছে।

 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সামিটকে ভবিষ্যতের এআই রূপ নির্ধারণের একটি সুযোগ হিসেবে ঘোষণা করেন, যেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাসহ উচ্চপর্যায়ের অতিথিরা অংশগ্রহণ করছেন।

 

তবে গেটসের আকস্মিক বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং একটি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন নির্মিত রোবটিক কুকুরকে নিজস্ব উদ্ভাবন হিসেবে প্রদর্শনের ঘটনা সামিটকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

 

সামিটে বিল গেটসের অংশগ্রহণ কেন ইস্যু হলো?

 

গেটসকে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেখানে তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ এবং ঝুঁকি নিয়ে আলোকপাত করার কথা ছিল। কিন্তু গত ৩১ জানুয়ারি মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত এপস্টেইনের ফাইলগুলোতে আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে গেটসের নামও উঠে আসে।

 

এ নিয়ে আবারও বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়, যার প্রেক্ষিতে ভারতীয় সরকারবিরোধী নেতারা এবং মিডিয়ার কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন যে, তার উপস্থিতি উপযুক্ত কি-না।

 

চলতি সপ্তাহের শুরুতে সব কিছু পরিকল্পনা মতো চলছিল। গত মঙ্গলবারও (১৭ ফেব্রুয়ারি) গেটস ফাউন্ডেশনের ভারতীয় অফিস এক পোস্টে জানায়, গেটস সামিটে অংশগ্রহণ করবেন এবং বক্তৃতা দেবেন।

 

কিন্তু দুদিন পরই বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বক্তৃতার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ফাউন্ডেশন এক বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ‘সাবধানতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং সামিটের মূল অগ্রাধিকার যোগ্য বিষয়গুলোতে মনোযোগ রাখতে গেটস সামিটে বক্তৃতা দেবেন না।‘ 

 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামিটে গেটসের পরিবর্তে বক্তৃতা দেবেন ফাউন্ডেশনের আফ্রিকা ও ভারত অফিসের সভাপতি অঙ্কুর ভোরা।

 

এপস্টেইন ও বিল গেটসের সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে অভিযোগগুলো কী?

 

জানুয়ারিতে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে গেটসের নাম উল্লেখ রয়েছে। সেই নথির মধ্যে একটি খসড়া ইমেইলে উল্লেখ আছে, এপস্টেইন জানিয়েছেন, গেটস বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক এবং রুশ মেয়েদের সঙ্গে যৌনতার পর যৌনরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং রোগ সারানোর জন্য কার্যকর ওষুধ পাওয়ার বিষয়ে তার সাহায্য চেয়েছিলেন।

 

কিন্তু ওই নথি থেকে এটা স্পষ্ট নয় যে, এপস্টেইন সত্যিই সেই ইমেইল পাঠিয়েছিলেন কি-না। গেটস এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ‘কোনো ভুল করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গেটস ফাউন্ডেশন দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক বিবৃতিতে এই অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ হাস্যকর ও মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 

এ বিষয়ে ভারত সরকার কী বলছে?

 

ভারতের সরকার এ বিষয়ে খুব কমই কথা বলেছে। বিরোধী দল ও বিশ্লেষকরা গেটসকে আমন্ত্রণ দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য চাপ দিলে সরকার সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে কিছু অজ্ঞাত সরকারি সূত্র জানিয়েছে, গেটস সামিটে উপস্থিত হবেন না। কিন্তু কেন, তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

 

প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সাংবাদিকদের স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও জনসমক্ষে কোনো মন্তব্য করেননি।

 

এপস্টেইন ফাইল ভারতের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয় কেন?

 

বিল গেটসের সামিটে অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক ভারতের জন্য সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কারণ এপস্টেইন ফাইল প্রকাশিত হওয়া এবং এ নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যে গেটসের নয়াদিল্লির এআই সামিটে অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা মোদি সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে।

 

ফাইলের একটি ইমেইলে এপস্টেইন উল্লেখ করেছেন, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ইসরাইলে নিজের প্রথম সফরের সময় ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুপ্রেরণায় নাচেন ও গান করেন’।

 

মোদির ইসরাইল সফর এবং এরপর নিতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন এরইমধ্যেই বিরোধীদের সমালোচনার মুখে। বিরোধী কংগ্রেস দল অভিযোগ করেছে, মোদি ফিলিস্তিনের প্রতি কয়েক দশকের ভারতীয় সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন।

 

ভারত ছিল প্রথম অ-আরব দেশ, যারা ১৯৭৪ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি।

 

তবে এপস্টেইনের ইমেইলটি মোদির ইসরাইল নীতির বিরোধীদের সমালোচনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে - এখন প্রশ্ন উঠেছে যে এই নীতি আসলেই ওয়াশিংটন দ্বারা প্রভাবিত কি-না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ইমেইলকে ‘এক দণ্ডিত অপরাধীর বাজে কল্পনা’ আখ্যা দিয়ে নাকচ করেছে।

 

আরও পড়ুন: চীনা রোবটকে নিজেদের দাবি, এআই সামিট থেকে বাদ ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

 

তবে এপস্টেইন সম্পর্কিত ঘটনা এখনও ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। ফাইলগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান তেলমন্ত্রী হরদ্বীপ সিং পুরি ২০১৪ সালে মোদির বিজেপিতে যোগ দেয়ার পর এপস্টেইনের সঙ্গে একাধিক ইমেইল বিনিময় করেছেন।

 

অনেক ইমেইলে তিনি এপস্টেইনের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের ভারতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। অন্য ইমেইলে ব্যক্তিগতভাবে এপস্টেইনের সঙ্গে সুসম্পর্কের ইঙ্গিত মিলছে।

 

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি লিখেছেন, ‘দয়া করে বলুন কখন আপনি আপনার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকে ফিরবেন’, এবং একটি বৈঠক আয়োজন করতে চেয়েছেন যাতে তিনি এপস্টেইনকে ভারত সম্পর্কে কিছু বই দেখাতে পারেন।

 

নথি সামনে আসার পর পুরি এক সম্মেলনে বলেছেন, তিনি কেবল তিন বা চারবার এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু বিরোধী কংগ্রেস দাবি করছে, ইমেইলগুলো প্রমাণ করছে তাদের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল।

 

ভারতে গেটসের নানা কর্মকাণ্ড

 

গেটস ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে, ব্যাপক ভ্যাকসিনেশন, রোগ প্রতিরোধ এবং স্বচ্ছতা প্রোগ্রামে অর্থায়ন করেছে।

 

তবে তিনি সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। পরিবেশকর্মী বন্দনা শিভা বলেছেন, গেটসের ‘ফিলানথ্রো-ইম্পেরিয়ালিজম’ তথা দাতব্য সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

 

২০২৪ সালে একটি পডকাস্টে গেটসকে আরও সমালোচনা করা হয়, যেখানে তিনি বলেন, ‘ভারত এক ধরনের ল্যাবরেটরি, যেখানে কাজগুলো পরীক্ষা করে দেখলে পরে তা অন্য জায়গায় নেয়া যায়’—এটি ফাউন্ডেশনের উন্নয়ন প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনার সময়ে বলা হয়েছিল।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন