নির্বাচনী ইশতেহার একটি রাজনৈতিক দলের লিখিত নীতিপত্র। নির্বাচিত হলে তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এতে তার রূপরেখা থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা চালু হয় যেন ভোটাররা প্রতিশ্রুতি ও নীতির ভিত্তিতে দল বেছে নিতে পারে। ইশতেহার তাই কেবল প্রচারণা বা কেবলই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি নয় এটি ভবিষ্যৎ শাসনের প্রতিশ্রুত নীতিগত কাঠামো।
অনেকগুলো দল অংশ নিলেও নির্বাচনে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা হচ্ছে মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহার পড়লে বোঝা যায়, তারা শুধু আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি দেয়নি বরং ভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রকাঠামো, শাসনধারা ও সমাজদর্শন কল্পনা করছে। এই পার্থক্যটি বোঝার জন্য ইশতেহারের ভাষা, উপস্থাপন ও প্রস্তাবনাসহ প্রতিশ্রুতির দিকগুলোকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
প্রথমেই ইশতেহারের ভাষা ও উপস্থাপনের বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করা যাক। খালি চোখে দেখলে যে ফারাক চোখে পড়ে সেটা হলো বিএনপির ইশতেহারে বড় আকারের ধারণা ও নীতিগত শব্দের উপস্থিতি বেশি। রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন- সব ভারী ভারী কথা।
অন্যদিকে জামায়াতের ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট একটা কৌশল দেখা গেছে। ছোট ছোট বাক্য, স্লোগানধর্মী উপস্থাপন, ভিজ্যুয়ালাইজেশনটা বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ছোট ছোট ভাগে সেকশনগুলো ভাগ করা। সব মিলিয়ে এটা ঠিক প্রচারণার ডকুমেন্টের মতো। দুর্নীতি না, ফ্যাসিবাদ না, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, সুশাসন- এ ধরনের ডিরেক্ট কমিউনিকেশন্স দ্রুত চোখে পড়ে। অনেকটা বিজ্ঞাপনের ভাষার মতো। চোখে দেখতে আর কানে শুনতে ভালো লাগে! মনে হয়েছে যে, বিএনপি মানুষকে বোঝাতে চায় নীতির গভীরতা দিয়ে আর জামায়াত তাদের কথা মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায় সরল ভাষা ও চোখে সহনশীল ভিজ্যুয়াল দিয়ে।
এবার আসা যাক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসন সংস্কারের বিষয়ে। দুই দলের রাষ্ট্রচিন্তার পার্থক্যটা এই জায়গাতে সবচেয়ে স্পষ্ট। বিএনপি বলছে ভোটের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন নিরসনে ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের মতো উদ্যোগ। এসব প্রস্তাব ইঙ্গিত করে, তারা বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে থেকে বড় ধরনের সংস্কার করতে চায়।
অন্যদিকে জামায়াত বলেছে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর), ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এখানে শুধু প্রশাসনিক আচরণ নয়; নির্বাচনী কাঠামো ও প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতিতেই পরিবর্তনের কথা আসে। খুব সহজভাবে এটাকে বোঝানো যায় এভাবে- বিএনপি বিদ্যমান যে কাঠামো আছে সেটাকেই সংস্কার করতে চায়। আর জামায়াত বদলে ফেলতে চায় প্রতিনিধিত্বের কাঠামোই।
শিক্ষানীতির ক্ষেত্রেও দুই দলের অগ্রাধিকার আলাদা। বিএনপি শিক্ষা খাতে জিডিপির একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (৫ শতাংশ) বরাদ্দের লক্ষ্য, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ট্যাব, ওয়াই-ফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। এখানে শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে; মানবসম্পদ উন্নয়নই মূল লক্ষ্য।
জামায়াত শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং মানবিক সমাজ গঠনের কথা বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক চরিত্র গঠনের বিষয়টি তাদের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে- বিএনপি শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নয়ন ও প্রযুক্তির হাতিয়ার হিসেবে দেখে আর জামায়াত দেখে সামাজিক চরিত্র গঠনের মাধ্যম হিসেবে।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়েও রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। বিএনপি স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট বৃদ্ধি, বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর কথা বলেছে। এটি প্রশাসনিক পরিষেবা সম্প্রসারণের একটি পরিকল্পনা, যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি সেবা প্রদানকারী হিসেবে সামনে আসে।
জামায়াত সামাজিক সুরক্ষা, দরিদ্রবান্ধব কল্যাণমূলক রাষ্ট্র এবং সুষম বণ্টনের ওপর জোর দিয়েছে। এখানে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয় বরং সামাজিক ন্যায় ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিএনপি স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রীয় পরিষেবা কাঠামোর হিসেবে দেখছে আর সেটাকে নিয়েছে জামায়াত সামাজিক নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে।
রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে দল দুটির আলাদা অবস্থান দেখা গেছে। বিএনপির ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন এবং “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির উল্লেখ আছে। এখানে রাষ্ট্রক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের আলোচনায় রাষ্ট্রের শক্তির চেয়ে শাসনের আচরণ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সুশাসন, জবাবদিহি, দমননীতি বিরোধিতা এবং প্রশাসনিক ন্যায়বিচার এগুলো প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যার মানে বিএনপি রাষ্ট্রের শক্তি ও কাঠামো নিয়ে কথা বলছে, জামায়াত শাসনের আচরণ ও নৈতিকতার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি বিষয় আলাদা করে চোখে পড়েছে। বিএনপির ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনবল নিয়োগের মতো খাতে বড় আকারের ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যা রাষ্ট্রনির্ভর ব্যয় সম্প্রসারণ মডেলের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই সেবা ও অবকাঠামো বাড়িয়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের ইশতেহারে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পূর্বশর্ত হিসেবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সুশাসন, দুর্নীতি রোধ ও ন্যায্য বণ্টন। এখানে বড় ব্যয় পরিকল্পনার চেয়ে শাসনপদ্ধতির স্বচ্ছতা ও কাঠামোগত শৃঙ্খলার ওপর জোর বেশি।
রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক নিয়েও দুই দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির প্রস্তাবগুলোতে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে শাসনব্যবস্থা কার্যকর হবে এই ধারণা সেখানে স্পষ্ট। জামায়াতের ইশতেহারে দলটি সমাজের নৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।
সবশেষে, রাজনৈতিক দর্শনেও রয়েছে বেশ পার্থক্য। বিএনপি তার ইশতেহারে আধুনিক প্রশাসনিক রাষ্ট্রকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার কথা বলেছে। যেখানে প্রতিষ্ঠান, কাঠামো ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জামায়াত চেয়েছে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, শাসনের চরিত্র এবং সমাজের মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে।
দুই দলের ইশতেহারেই পরিবর্তনের কথা রয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের ধারণাটা দুই দলের কাছে ভিন্ন। একটি দল রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে থেকে সংস্কার, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছে। আরেকটি দল প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ও শাসনব্যবস্থার চরিত্রে পরিবর্তনের কথা বলছে, যেখানে নৈতিকতা ও রাজনৈতিক কাঠামোগত রূপান্তর গুরুত্ব পাচ্ছে।
একটি পথ সংস্কারকেন্দ্রিক, অন্যটি কাঠামোগত রূপান্তরমুখী। ইশতেহার দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি জানায়, বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে। অতীতে আমরা দেখেছি যে, ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ খামখেয়ালী আচরণ করেছে। নতুন বাংলাদেশে মানুষ মর্যাদার সাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। নির্বাচনী ইশতেহার তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছরগুলোতে দেশের দায়িত্ব কোনো দলের হাতে তুলে দেওয়ার আগে মানুষ অবশ্যই তার ইশতেহারের বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে।
]]>
২ সপ্তাহ আগে
৩







Bengali (BD) ·
English (US) ·