বাবা ছিলেন জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, ছেলে তারেক রহমানের সরকারের মন্ত্রী

১ ঘন্টা আগে
রাঙ্গামাটি শহরের কলেজ গেট সংলগ্ন এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘মন্ত্রীপাড়া’ নামে পরিচিত। এই নামের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন সম্প্রতি শপথ নেয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। বাবার পর ছেলেও মন্ত্রী হওয়ায় রাঙ্গামাটিবাসীর মুখে মুখে এখন একটাই কথা, ‘অবশেষে সার্থক হলো নাম, পূর্ণ মন্ত্রী পেল মন্ত্রীপাড়া’।

দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। মূলত তখন থেকেই কলেজ গেট সংলগ্ন দীপেন দেওয়ানদের বাড়ি ও আশপাশের এলাকার নাম হয়ে যায় ‘মন্ত্রীপাড়া’।

 

এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান দীপেন দেওয়ান। রাঙ্গামাটি থেকে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য হিসেবে তিনিই প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী হলেন। তার পাশাপাশি এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন মীর হেলাল।

 

বিচারকের চেয়ার ছেড়ে রাজনীতি এবং ১৮ বছরের অপেক্ষা

 

৬৩ বছর বয়সি দীপেন দেওয়ানের শেকড় রাজনীতিতেই। ছাত্রাবস্থায় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরিবারের চাপে সপ্তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। তবে রাজনীতি যার রক্তে, সরকারি চাকরিতে তার মন টেকেনি। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান দলত্যাগ করলে দলে যোগ্য নেতার সংকট তৈরি হয়। তখন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ২০ বছরের জুডিশিয়াল সার্ভিসের চাকরি (যুগ্ম জেলা জজ) ছেড়ে রাজনীতিতে ফেরেন তিনি।

 

তবে আইনি জটিলতায় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি তিনি। কারণ সরকারি চাকরি ছাড়ার পর তিন বছর পূর্ণ হয়নি। এরপর দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষা। অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ভোটের মাঠে নামেন এই নেতা।

 

আরও পড়ুন: আইন লঙ্ঘন করে তৈরি রিসোর্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে: দীপেন দেওয়ান

 

বিপুল ভোটে জয়

 

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন দীপেন দেওয়ান। পাঁচ লাখের বেশি ভোটারের রাঙ্গামাটি আসনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৩১ হাজার ২২২ ভোট। ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২২ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন তিনি।

 

২০১০ সালে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়া দীপেন দেওয়ান বর্তমানে কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই জয়ে রাঙ্গামাটিজুড়ে বইছে উচ্ছ্বাস। জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার বলেন, ‘পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সুষম উন্নয়নে বিএনপি কাজ করবে। নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

 

হলফনামায় সম্পদের বিবরণী

 

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, এলএল-বি (অনার্স) ও এলএল-এম ডিগ্রিধারী দীপেন দেওয়ান বর্তমানে আইন পেশায় নিয়োজিত। তার স্ত্রী মৈত্রী চাকমা পেশায় ব্যবসায়ী, আগে শিক্ষকতা করতেন।

 

আয়: আইন পেশা থেকে তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং বাড়ি ভাড়া থেকে আসে ৯০ হাজার টাকা। ব্যাংক ও শেয়ার থেকে আসে ১ হাজার ১৪৯ টাকা। অন্যদিকে তার ওপর নির্ভরশীলদের ব্যবসা ও শেয়ার/ব্যাংক থেকে বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৬২ টাকা।

 

আরও পড়ুন: তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ৫০ জন যোগ দিলো বিএনপিতে

 

অস্থাবর সম্পদ: দীপেন দেওয়ানের নামে নগদ ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৫ টাকা, ব্যাংকে ২০ হাজার ৬৩ টাকা এবং ১৮ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এছাড়া তার ১ লাখ টাকা মূল্যের (অধিগ্রহণকালীন) ২০ ভরি সোনা, দেড় লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ১ লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। তার মোট অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২ কোটি ১৪ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৫ টাকা।

 

অন্যদিকে, তার স্ত্রীর নামে নগদ ৯৮ লাখ ২৪ হাজার ৮০২ টাকা, ব্যাংকে ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৪৯ টাকা এবং ৪৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। স্ত্রীর নামে আরও রয়েছে দেড় লাখ টাকা মূল্যের (অধিগ্রহণকালীন) ৫০ ভরি সোনা, ২৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের পরিবহন এবং অন্যান্য সামগ্রীসহ মোট ২ কোটি ৬৪ লাখ ২৪ হাজার ৮০২ টাকার অস্থাবর সম্পদ।

 

স্থাবর সম্পদ: দীপেন দেওয়ানের নামে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের (অধিগ্রহণকালীন) ২৬ শতক অকৃষি জমি এবং ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি চারতলা দালান ও টিনশেড ঘর রয়েছে। এসব সম্পদের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই।

 

ঋণ ও মামলা: বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে দীপেন দেওয়ানের ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩০৩ টাকার গৃহঋণ বকেয়া রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ ও ২০২০ সালে রাঙ্গামাটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তার বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা হয়, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

 

আয়কর: আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী, দীপেন দেওয়ান চলতি বছর ৪ লাখ ৪১ হাজার ১৪৯ টাকা আয়ের বিপরীতে ১১৬ টাকা কর দিয়েছেন এবং তার মোট প্রদর্শিত সম্পদ ২ কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮৭ টাকা। তার স্ত্রী ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৬২ টাকা আয়ের বিপরীতে ৫৭ হাজার ১৩২ টাকা কর দিয়েছেন এবং তার প্রদর্শিত সম্পদ ২ কোটি ৩০ লাখ ১৫ হাজার ৯৫১ টাকা।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন