বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দুর্বলতায় রংপুরে জামায়াতের উত্থান

২ সপ্তাহ আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনৈতিক পালাবদলে রংপুর বিভাগে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাতীয় পার্টির দুর্গ তছনছ করে এবার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে ১১ দলীয় জামায়াত জোট।

বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৬টিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি পেয়েছে আরও দুটি আসন। সব মিলিয়ে ১৮টি আসন তাদের দখলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটের স্বাভাবিক সমীকরণ ভেঙে গেছে। তবে জামায়াতের এত আসন পাওয়ার পেছনে আরও দুটি বড় কারণ হলো জাতীয় পার্টির (জাপা) ভাঙন ও বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা।

 

আসনভিত্তিক ফলাফল: রংপুর জেলার ৬টি আসনের ৫টিতে জামায়াত, ১টিতে এনসিপি জয়ী হয়েছে। গাইবান্ধার ৫টির ৪টিতে জামায়াত, ১টিতে বিএনপি। কুড়িগ্রামের ৪টির ৩টিতে জামায়াত, ১টিতে এনসিপি। নীলফামারীর ৪টিতেই জয় পেয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে লালমনিরহাটের ৩ আসন, পঞ্চগড়ের ২ আসন ও ঠাকুরগাঁওয়ের ৩টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। দিনাজপুরের ৬টির ৫টিতে বিএনপি এবং ১টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

 

জাতীয় পার্টির দুর্গপতন: রংপুরকে একসময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এর নেপথ্যে মূল কারণ ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। কিন্তু তার মৃত্যুর পর নেতৃত্ব সংকট, মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দলটি দুর্বল হয়ে পড়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপার রংপুরের এক নেতা বলেন, ‘এরশাদ সাহেবের পর আমরা আগের মতো সংগঠন ধরে রাখতে পারিনি। দল পুনর্গঠনের কাজই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’

 

আরও পড়ুন: গুরুত্বপূর্ণ ৪ মন্ত্রী পেল রংপুর বিভাগ

 

ভোটের মাঠেও জাপার দুর্বল উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। দলীয় সূত্র বলছে, ভোটের দিন সকাল থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে কোথাও দেখা যায়নি। মাঠে ছিলেন না জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও।

 

২০০৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২১টিতে এবং জাতীয় পার্টি ১২টিতে জয়লাভ করে। তবে এবারের নির্বাচনে জাপার দুর্বলতা ও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার চরিত্র বদলে দিয়েছে। জাপার একটি বড় ভোটব্যাংক বিকল্প শক্তির দিকে সরে যাওয়ায় ফলাফলে বড় প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর মহানগর সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই, জাতীয় পার্টির জন্ম হয়েছে একটা আবেগ থেকে। আর সেই আবেগকে কাজে লাগিয়েছিলেন এরশাদ সাহেব। তবে যে ইমোশন এরশাদের প্রতি ছিল, উনি মারা যাওয়ার পরে ক্রমান্বয়ে সেটা কমতে থাকে। একইসাথে বর্তমানে যারা জাতীয় পার্টিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা দলকে সত্যিকার অর্থে সুসংগঠিত করতে পারেননি। ফলে আবেগে ভাটা পড়াসহ নেতৃত্ব সংকটের কারণেই জাতীয় পার্টির এমন পরাজয়।’

 

বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা: রংপুরে বিএনপির ভরাডুবির পেছনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিলম্ব, নতুন মুখ, মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়গুলো সামনে আসছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘আমরা অনেক আসনে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। তবে কিছু সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এবং ভোটের বাস্তবতায় ফল আমাদের পক্ষে আসেনি।’

 

আরেক নেতা বলেন, ‘আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ ভোট ছিল। একে তো দেরিতে মনোনয়ন দিয়েছে, তার ওপর মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ ছিল চরমে। যে কারণে দলের অনেক বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তবে যদি বলি, এই অঞ্চলে আমরা আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছি।’

 

আরও পড়ুন: রংপুরে সিলমারা ব্যালট উদ্ধার, ইউএনও’র গাড়ি ভাঙচুর

 

জামায়াতের কৌশল ও উত্থান: অন্যদিকে জামায়াত প্রায় দেড় বছর আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নামে। ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ায়। নারী ও তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে প্রচারণা চালায়। দীর্ঘদিনের শিক্ষা, সামাজিক ও দাতব্য কার্যক্রমও তাদের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। একইসাথে এই অঞ্চলের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি ছিল অন্যতম কারণ।

 

কাউনিয়ার তরুণ ভোটার জাহিদুল ইসলাম জসিম বলেন, ‘যিনি এলাকায় থাকবেন এবং কাজ করবেন, তাকেই আমরা ভোট দিয়েছি। নতুন দেশ গড়ার জন্য এবার আমরা নতুন নেতৃত্ব দেখতে চেয়েছি।’

 

রংপুর-৩ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘আমরা মানুষের জন্য কাজ করি। সংসদে গিয়ে তাদের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেব।’

 

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ত্বহা হুসাইন বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান মূলত রাজনৈতিক শূন্যতার ফল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং জাতীয় পার্টির মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে, জামায়াত সেটি কাজে লাগাতে পেরেছে। এছাড়া অনেকে প্রচলিত দলগুলোর বাইরে গিয়ে বিকল্প খুঁজেছেন। দীর্ঘদিন একই শক্তিকে দেখার পর নতুন কাউকে পরখ করে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। সেটিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।’

 

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে সারা দেশে ১৮টি আসন পায় জামায়াত। ১৯৯৬ সালে এটি ৩টিতে নেমে আসে। ২০০১ সালে আবার এটি ১৭তে উন্নীত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে এবার জোটগতভাবে সারা দেশে ৭৭টি এবং রংপুর বিভাগে ১৮টি আসন পাওয়া দলটির জন্য বড় পুনরুত্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন