বরিশাল জিলা স্কুলের সাদা শার্টের সেই কিশোর এখন সংসদের স্পিকার

৪ সপ্তাহ আগে
সাদা শার্ট আর প্যান্টে যে কিশোরটি একদিন স্কুলের বারান্দা মাতিয়ে বেড়াতেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই মেধাবি ছাত্রটিই আজ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার।

বীর বিক্রম খেতাবধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের এই বর্ণাঢ্য অভিযাত্রা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

 

​ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বরিশাল জিলা স্কুল ও সরকারি ব্র‍জমোহন (বিএম) কলেজের প্রাক্তণ ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মাঝে বইছে উৎসবের আমেজ।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অভিনন্দনের জোয়ারে একটি কথাই বারবার উঠে আসছে, 'আমাদের বরিশালের কৃতি সন্তান আজ সংসদের অভিভাবক।’

 

অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন, 'হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই অর্জন প্রমাণ করে যে, মেধা, নেতৃত্বগুণ আর অদম্য দেশপ্রেম থাকলে দেশের প্রত্যন্ত আঙিনা থেকে উঠে এসেও দেশের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।'

 

১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্ম নেন (অব.) মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।

 

আরও পড়ুন: সাতবারের এমপি ও তিনবারের মন্ত্রী স্পিকার মেজর হাফিজ, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাও

 

তিনি ১৯৫৯ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্র‍িক ও ১৯৬১ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৬৮ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া এই তরুণ ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ যশোরে থাকা অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

 

সম্মুখ সমরে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য দেশ তাকে দিয়েছে ‘বীর বিক্রম’ উপাধি। শুধু রণাঙ্গন নয়, ষাটের দশকে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের 'দ্রুততম মানব'।

 

ট্র্যাক এন্ড ফিল্ড থেকে শুরু করে ফুটবল মাঠ-সবখানেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবেও তিনি কুড়িয়েছেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি।

 

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া হাফিজ উদ্দিন ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর যশোরের জগদীশপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে ভারত থেকে ফিরে কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও সিলেটের এমসি কলেজের সম্মুখ সমরে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে।

 

রাজনীতি ও সামরিক জীবনের বাইরেও হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন মৌসুম তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব। ফুটবল মাঠেও ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনায়ক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল তুঙ্গে। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে বাফুফে সভাপতি এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

 

বরিশাল জিলা স্কুলের এলামনাই এ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ফয়সাল আহমেদ বলেন, 'জিলা স্কুলের এই কৃতি সন্তান আমাদের শেকড়কে সম্মানিত করেছেন। তিনি আমাদের স্কুলের গর্ব, বরিশালের অহংকার।'

 

অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদের ঘনিষ্ঠজন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ জানান, ​'বরিশাল নগরীর ইশ্বরবসু রোড এলাকায় থাকতেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। পাশ্ববর্তী এলাকায় থাকায় এক সাথে খেলাধুলার মধ্যে দিয়ে তাদের মধ্যে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরি হয়। সে সময় থেকেই তিনি একজন মেধাবি শিক্ষার্থীর পাশাপাশি ভালো খেলোয়াড়ও ছিলেন। সংসদ পরিচালনায় তাঁর শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তা দেখতে পাব- এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।'

 

বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী মেহজাবিন হক জানান, 'একজন বিএম কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে খুব বড় মনে হচ্ছে। স্পিকার হিসেবে উনার এই যাত্রা আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শেখাবে। মেধা থাকলে লালমোহন থেকে এসেও পুরো দেশ শাসন করা যায়।'

 

আরও পড়ুন: জুলাই সনদ নিয়ে অহেতুক সৃষ্ট বিতর্ক কার্যকর সংসদের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ: স্পিকার

 

বিএম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন বলেন, 'বিএম কলেজ সবসময়ই নেতৃত্ব তৈরীর কারখানা। আমাদের কলেজের একজন প্রাক্তন আজ সংসদের অভিভাবক এটি আমাদের জন্য পরম পাওয়া। তাঁর এই অর্জন আগামী দিনের ছাত্রনেতাদের জন্য সততা ও দেশপ্রেমের এক বড় শিক্ষা।'

 

উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন বরিশালের আবদুল ওহাব খান ও ১৯৬৫ সালে স্পিকার ছিলেন আব্দুল জব্বার খান। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বরিশাল বিভাগ থেকে স্পিকার হলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন