প্রতিবেশী কারা?
হাসান বসরি রহ.-কে প্রতিবেশী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, নিজের ঘর থেকে সামনের ৪০টি, পেছনের ৪০টি, ডানের ৪০টি এবং বাঁয়ের ৪০টি ঘরের অধিবাসীরাই প্রতিবেশী।
কোরআনে প্রতিবেশীর হক
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে সুরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহর ইবাদাত ও তার সাথে কাউকে শরিক না করা-এই বিধানের সাথে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের হক। তার মধ্যে রয়েছে মাতা পিতার হক, আত্মীয় স্বজনের হক, এতীমের হক ইত্যাদি। এসব গুরুত্বপূর্ণ হকের সাথেই আল্লাহ প্রতিবেশীর হককে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, প্রতিবেশীর হককে আল্লাহ কত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তা রক্ষা করা আমাদের জন্য কত জরুরি। আল্লাহ বলেছেন,
তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং কোনো কিছুকে তার সাথে শরিক করো না। এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতীম, অভাবগ্রস্থ, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের দাস-দাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সুরা নিসা: ৩৬)
আরও পড়ুন: রোজাদারের ১০ ফজিলত
হাদিসে প্রতিবেশীর হক
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (বুখারি: ৬০১৮) এখানে কষ্ট না দেওয়ার অর্থ হলো, মানুষের কাছ থেকে এমন কোন কথাবার্তা বা কাজকর্ম প্রকাশ না পাওয়া যার কারণে তার প্রতিবেশী শারীরিক অথবা মানসিক কষ্ট পায়। কষ্ট দেওয়ার জন্য তাকে প্রহার করতে হবে ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
জিবরাইল আ. আমাকে সর্বদাই প্রতিবেশী সম্পর্কে অসিয়ত করতেন। এমন কি আমি এ আশঙ্কা করতাম যে, হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারে গণ্য করা হবে। (বুখারি: ৬০১৪)
প্রতিবেশীদের সাথে সদাচরণ নিয়ে আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যে হাদিসগুলো পড়লে মনে হবে যে, প্রতিবেশী আর নিজ পরিবারের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। তারা যেন আমাদের পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রতিবেশীর সম্মান করা ঈমানের নিদর্শন
আবু শুরাইহ আদাবি রা. বলেন, আমি নিজ কানে শুনেছি, নিজ চোঁখে দেখেছি। যখন রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যে তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।’ (মুসনাদে ইবনে আবি শাইবা: ৯৭১)
উক্ত হাদিসের অন্যতম বর্ণনাকারী আতা খোরাসানি রহ.-এর কাছে প্রতিবেশীর অধিকার কী কী জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,
যখন প্রতিবেশী সাহায্য চায়, তাকে সাহায্য করা। যখন ঋণ চায়, ঋণ দেওয়া। প্রতিবেশী দরিদ্র হলে তাকে দান করা। অসুস্থ হলে সেবা করা। ভালো কিছু অর্জন করলে তাকে অভিনন্দন জানানো। বিপদে পতিত হলে সান্ত্বনা জানানো। মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া। প্রতিবেশীর অনুমতি ছাড়া ঘর এত উঁচু তৈরি না করা, যাতে প্রতিবেশীর ঘরে বাতাস প্রবেশে বিঘ্ন ঘটে। প্রতিবেশীকে নিজের ঘরের রান্নার ঘ্রাণ দিয়ে কষ্ট না দেওয়া; তবে তাকে খাবারের কিছু অংশ দিলে ভিন্নকথা।
অনুরূপ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
পরিবেশের অধিকার রক্ষা করা পরিপূর্ণ ঈমানের নিদর্শন। এমনকি ইসলামপূর্ব যুগেও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করার ধরন হচ্ছে, সাধ্যমত প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করা। যেমন: তাকে হাদিয়া দেওয়া, সালাম দেওয়া। তার সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করা। তার খোঁজ খবর নেওয়া। প্রয়োজনের সময় তাকে সাহায্য করা। বাহ্যিক ও মানসিক দিক থেকে কষ্ট না দেওয়া এবং কষ্টের কারণ দূর করা।'
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া মুশরিকদের নিদর্শন
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তিনি মক্কায় থাকাকালীন প্রতিবেশীরা কতই না কষ্ট দিয়েছিল। তারা অধিকাংশরাই ছিল মূর্তিপূজারী মুশরিক। ইবনে ইসহাক বলেন, ‘মক্কার যেসব লোক রাসুল সা.-কে কষ্ট দিত, তারা হচ্ছে আবু লাহাব, হাকাম বিন আস বিন উমাইয়া, উকবা ইবনে আবু মুঈত, আদি বিন হামলা সাকাফি, ইবনে আসদা হুজালি প্রমুখ। এরা ছিল রাসুলের প্রতিবেশী।
তাদের কেউ এসে সদ্য প্রসব করা ছাগলের নাড়িভুড়ি এনে নামাজ পড়া অবস্থায় রাসুল সা.-এর ওপর ফেলত। রাসুল সা. তখন তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে আবদে মানাফের গোত্র, এ কোন ধরনের প্রতিবিশীত্ব?!
আবু লাহাবের স্ত্রী (উম্মে জামিল) পাহাড় থেকে কাঁটাযুক্ত ডালপালা এনে রাসুল সা.-এর ঘরের দরজার সামনে ফেলে রাখত, যেন তিনি ঘর থেকে বের হতে না পারেন অথবা বের হওয়ার সময় যেন তার পা কাটাবিদ্ধ হয়।
যার অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশী অনিরাপদ তার ঈমানের ব্যাপারে আশঙ্কা আছে। আবু শুরাইহ রা. বর্ণনা করেন, নবীজি সা. বলেছেন,
আল্লাহর কসম, সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম, সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞাসা করা হলো, কে সে হে আল্লাহর রাসুল? রাসুল সা. উত্তর দিলেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়। (বুখারি: ৬০১৬)
এই হাদিস প্রমাণ করে, প্রতিবেশীর অধিকারের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, রাসুল সা. আল্লাহর নামে কসম করেছেন। সে কসমও একবার নয়, বরং তিনবার কসম করে একই কথা বলেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কথায় বা আচরণে কষ্ট দেয়, তার ঈমান আশঙ্কাপূর্ণ। তবে ইমান দ্বারা এখানে পূর্ণ ইমান উদ্দেশ্য। আর নিঃসন্দেহে একজন গুনাহগার পূর্ণ মুমিন নয়।
আল্লাহর রাসুল সে লোকের ঈমান নিয়ে আশঙ্কা করলেন, যে তার প্রতিবেশীর অনিষ্ট সাধন করে। প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে এ কথাটি সবোর্চ্চ গুরুত্ব প্রকাশক। এ হাদীস থেকে আরও বোঝা গেল, প্রতিবেশীর ক্ষতি করা কবিরা গুনাহ।
প্রতিবেশীর অনিষ্টকারীর আমল কবুল হয় না
আবু হুরায়রা রা. বলেন, 'এক লোক রাসুল সা.-কে বলল, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, এক নারী তার অত্যধিক নামাজ, রোজা, দানের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু সে কথার মাধ্যমে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তার ব্যপারে আপনি কী বলেন? রাসুল সা. বললেন, সে জাহান্নামি। লোকটি আবার বলল, হে রাসুল, আরেক নারীর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ আছে যে, সে রোজা কম রাখে, দানও কম করে এবং নামাজও কম পড়ে। বলতে গেলে সে এক টুকরা পনিরই দান করে না। কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন?” রাসুল সা. জবাব দিলেন, সে জান্নাতি। (আল আদাবুল মুফরাদ: ১১৯)
আরও পড়ুন: যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায়
অমুসলিমও প্রতিবেশী হতে পারে
মুজাহিদ রহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাজি.-এর ঘরে একটি ছাগল জবাই হলো। তিনি পরিবারকে জিজ্ঞাসা করলেন,
তোমরা কি আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে ছাগলের গোশত হাদিয়া দিয়েছ? কেননা আমি রাসুল সা.-কে বলতে শুনেছি, “জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি ওসিয়ত করেছেন যে, আমার আশঙ্কা হয়েছে যে, অচিরেই প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে ওহি নাজিল হবে। (তিরমিজি: ৯৬৬৯)
ইবনে হাজার রহ. বলেন, প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা কাফের, ইবাদতগুজার বা পাপাচারী, বন্ধু বা শত্রু, মুসাফির বা স্থানীয়, সব ধরনের প্রতিবেশির ক্ষেত্রে অবস্থা বিবেচনায় প্রতিবেশিত্বের অধিকার প্রযোজ্য হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জামেয়া দারুল মাআ'রিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম।
]]>