পাম্পে ‘ফুয়েল পাস’: ভোগান্তি কতটা কাটল?

১ সপ্তাহে আগে
রাজধানীর রাজপথে তপ্ত দুপুরের ক্লান্তি ছাপিয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে এখনও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে গাড়ির সারি। জ্বালানি তেলের বাজারে স্বচ্ছতা আনতে ও অস্থিরতা নিরসনে শুরু হওয়া অ্যাপভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ কার্যক্রমের পরিধি বাড়লেও, মাঠপর্যায়ে ভোগান্তির চিত্রটি এখনও অমলিন। ডিজিটাল এই রূপান্তরের সুফল যেমন মিলছে, তেমনি খেসারতও দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। পাম্পে পাম্পে কিউআর কোড স্ক্যান করার যে সহজ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তা কোথাও স্বস্তি আবার কোথাও চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’-এর মাধ্যমে পেট্রোল বা অকটেন দেয়া হলেও বুধবার (২২ এপ্রিল) রাজধানীর রমনা ও তেজগাঁও এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ‘ফুয়েল পাস’ বাধ্যতামূলক করায় পাম্পের প্রবেশমুখের জটলা কিছুটা কমলেও লাইনের দৈর্ঘ্য কমেনি। ৪ থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন কারিগরি কারণে অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে না, তখন ভোক্তাদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে পাম্প কর্মীদের ওপর। যারা বাটন ফোন ব্যবহার করেন কিংবা অ্যাপ ইনস্টল ও স্ক্যানিং সম্পর্কে ধারণা রাখেন না, তাদের অবস্থা আরও করুণ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর শেষ মাথায় এসে যখন তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে, তখন বাগ্‌বিতণ্ডা হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
 

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপে অভ্যস্ত চালক কিংবা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে দক্ষ তরুণদের কাছে পদ্ধতিটি বেশ সহজ মনে হয়েছে। অনেককে দেখা গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের রেজিস্ট্রেশন করতে সহযোগিতা করে বাহবা নিতে।
 

রমনা পাম্পে তেল নিতে আসা বাইক ও গাড়ির লাইন সেগুনবাগিচা মোড় হয়ে বারডেম-২ হাসপাতালের সামনে পুরো রাস্তাটি তীব্র যানজট সৃষ্টি করেছে। ছবি: কে এম তানজিদ ইমাম


অ্যাপের মাধ্যমে তেল নিতে প্রয়োজন সচল মোবাইল নম্বর ও ইন্টারনেট সংযোগ। গুগল প্লে স্টোর থেকে ‘Fuel Pass’ অ্যাপ ডাউনলোড করে বাইকের চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বরের শেষ চারটি সংখ্যা দিয়ে একবার রেজিস্ট্রেশন করলেই মেলে কিউআর কোড। তবে প্রতিটি কোড স্ক্যান করে কনফার্ম করা, পেমেন্ট হিসাব করা এবং এর মাঝে ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে সময় লেগে যাচ্ছে অনেক। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রত্যেক গ্রাহকের পেছনে বাড়তি সময় ব্যয় হওয়ায় লাইন ছোট করা সম্ভব হচ্ছে না।
 

আরও পড়ুন: জামায়াত নেতার বাড়িতে পেট্রোল: পেপার কাটিং দেখিয়ে প্রতিমন্ত্রী বললেন ‘নাউজুবিল্লাহ’


আগে নির্দিষ্ট ৪০০ বা ৫০০ টাকার বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছিল না, কিন্তু অ্যাপ ব্যবহারকারীরা এখন ১ হাজার ৫০০ টাকা বা ‘ফুল ট্যাংক’ তেল নিতে পারছেন। শাহবাগের ‘মেঘনা মডেল পাম্পে’ তেল নিতে আসা এক বাইকার বলেন, ‘লাইন দীর্ঘ হলেও নিশ্চিতভাবে ফুল ট্যাংক তেল পাচ্ছি, এটাই বড় স্বস্তি।’


মেঘনা মডেল পাম্প (শাহবাগ), সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশন (আসাদগেট), ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনসহ (বিজয় সরণি)সহ বেশ কয়েকটি পাম্প ছাড়া মতিঝিল, তেজগাঁও, আরামবাগ দৈনিক বাংলার পাম্পগুলোতে কথা বলে জানা যায়, এখনো অ্যাপের ব্যাপারে সবাই জানে না, বিশেষ করে যারা ব্যাক্তিগত মোটরবাইক ব্যাবহার করেন।
 

মতিঝিল, আরামবাগ ও দৈনিক বাংলা এলাকার পাম্পগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যক্তিগত বাইক ব্যবহারকারীদের অনেকেই এখনও অ্যাপের বিষয়টি জানেন না। দৈনিক বাংলার একটি পাম্পের ম্যানেজার বলেন, ‘সবাইকে ফেরানো যাচ্ছে না। আমরা ২০০-৩০০ টাকার তেল দিয়ে দিচ্ছি এবং সতর্ক করছি যে পরের বার অ্যাপ ছাড়া তেল মিলবে না।’ অন্যদিকে মতিঝিলের করিম পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘তিন-চার ঘণ্টা রোদ-গরমে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে একেবারে নিরাশ করাটা মানবিকতায় বাধে।’
 

আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পরও কেন কাটছে না দুর্ভোগ?


রমনা পেট্রোল পাম্পের মোটরবাইক ও প্রাইভেট কারের লাইন মৎস্য ভবন থেকে শিল্পকলা ও সেগুনবাগিচা হয়ে বারডেম-২ হাসপাতালের সামনে দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব ও হাইকোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বারডেম হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলো জ্যামের কারণে নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। প্রায় প্রতিটি পাম্পের সামনেই এমন জটলা লক্ষ করা গেছে, যদিও গত দু-এক দিনের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত।
 

রমনা পেট্রোল পাম্পের সামনে তেল নিতে মোটরবাইক এবং প্রাইভেট গাড়ির দীর্ঘ লাইন। ছবি: কে এম তানজিদ ইমাম


পাম্প পরিচালনাকারীরা আশা করছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই নতুন পদ্ধতির সঙ্গে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেলে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ভোক্তাদের মতে, কোনো ভোগান্তিই কাম্য নয়; তবে ‘ফুয়েল পাস’ যদি সত্যিই তেলের কালোবাজারি রোধ করতে পারে, তবে এই সাময়িক কষ্ট সার্থক হবে। এর মাধ্যমেই দেশের জ্বালানি খাতে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের নতুন এক যুগের সূচনা হলো।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন