২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিবারের পাঁচ সদস্য মারা যান। পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলায় আলাদা আলাদা ‘পুলিশ এনকাউন্টার’-এ তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন জুবাইদার তিন ছেলে—ইমরান (২৫), ইরফান (২৩), আদনান (১৮)—এবং দুই জামাতা।
পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অফ পাকিস্তান (এইচআরসিপি) এর একটি তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশনকে সেইদিনের সেই ভয়াল ঘটনার কথা জানিয়ে জুবাইদা বলেন, পুলিশ তাদের বাড়ি ভেঙে সবকিছু নিয়ে যায়। তিনি ও তার পরিবার লাহোরে গিয়ে ছেলেদের মুক্তির জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু পরদিন সকালেই পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পান।
পরে তিনি আদালতে মামলা করলে পুলিশ তাকে হুমকি দেয়, মামলা না তুললে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও হত্যা করা হবে। তার স্বামী আবদুল জব্বার বলেন, তাদের ছেলেদের কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। তারা সবাই বিবাহিত এবং কাজকর্ম করতেন।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বোমা হামলা, ১১ সেনা নিহত
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান-এইচআরসিপি। তাতে বলা হয়, পাঞ্জাবের সিসিডি আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৬৭০টি ‘এনকাউন্টার’-এ ৯২৪ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। সিসিডি গঠন করা হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে, বড় ও সংগঠিত অপরাধ দমনের জন্য।
এইচআরসিপি বলছে, সিসিডি আসলে একটি ‘সমান্তরাল পুলিশ বাহিনী’, যারা প্রায় শাস্তির বাইরে থেকে কাজ করছে। এর ফলে আইনের শাসন ও নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংস্থাটির পরিচালক ফারাহ জিয়া বলেন, ১৯৬০-এর দশকে পাঞ্জাবেই প্রথম এনকাউন্টার হত্যার সংস্কৃতি শুরু হয়। পরে তা অন্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে সিন্ধুতে। তিনি বলেন, অপরাধ দমনে ভালো তদন্ত, ফরেনসিক ব্যবস্থা ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে সরকার শর্টকাট হিসেবে বেআইনি পথ বেছে নিচ্ছে।
নতুন বাহিনীর দ্রুত উত্থান
গত বছরের মে মাসে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ–এর অধীনে সিসিডি গঠন করা হয়। সরকারের দাবি, ‘সেইফ পাঞ্জাব’ গড়তেই এই বাহিনী তৈরি করা হয়েছে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে। সিসিডি গঠনের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এনকাউন্টার বেড়ে যায়।
আট মাসে ৯০০-র বেশি সন্দেহভাজন নিহত হন। একই সময়ে দুই পুলিশ সদস্য নিহত ও ৩৬ জন আহত হন। তুলনায় ২০২৪ সালে পাঞ্জাব ও সিন্ধু মিলিয়ে পুরো বছরে ৩৪১ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু সিসিডি এক প্রদেশেই আট মাসে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে হত্যা করেছে।
সবচেয়ে বেশি এনকাউন্টার হয়েছে লাহোরে (১৩৯টি), এরপর ফয়সালাবাদ (৫৫টি) ও শেখুপুরা (৪৭টি)। নিহতদের মধ্যে ৩৬৬ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ ছিল। মাদক মামলায় ১১৪ জন, ছিনতাইয়ে ১৩৮ জন এবং খুনের মামলায় ৯৯ জন অভিযুক্ত ছিলেন।
ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় একই রকম বয়ান
প্রতিবেদন বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশের বর্ণনা প্রায় একই রকম। বলা হয়, সন্দেহভাজনরা মোটরসাইকেলে ‘সন্দেহজনকভাবে’ চলছিল। পুলিশ থামালে তারা আগে গুলি চালায়, পরে আত্মরক্ষায় পুলিশ গুলি করে। এতে সন্দেহভাজন নিহত হয়, আর তার সহযোগীরা অন্ধকারে পালিয়ে যায়।
এইচআরসিপি পর্যবেক্ষণ করেছে, অনেক এফআইআরে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও বলা হয়েছে, আহত সন্দেহভাজন মারা যাওয়ার আগে নিজের নাম-ঠিকানা ও অপরাধের ইতিহাস বলে গেছে। সংস্থাটি বলছে, এগুলো অনেক ক্ষেত্রে ‘কপি-পেস্ট’ করা বর্ণনা মনে হয়।
লাহোরের মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামাল বলেন, সরকার দাবি করছে অপরাধ কমেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে বিচারবহির্ভূত হত্যা বৈধ হয়ে যায়।
সরকার ও পুলিশের বক্তব্য কী
পুলিশের দাবি, তাদের অভিযান অপরাধ ৬০ শতাংশের বেশি কমিয়েছে। তারা বলছে, তারা গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক পুলিশিং করছে এবং বড় অপরাধচক্র ভেঙে দিয়েছে। তবে এইচআরসিপি বলছে, অপরাধ কমলেও পদ্ধতিটা গুরুত্বপূর্ণ। বিচার প্রক্রিয়া না মেনে সরাসরি হত্যা করলে তা আইনের শাসনকে দুর্বল করে।
অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে, দ্রুত লাশ দাফনের জন্য চাপ দেওয়া হয়, যাতে স্বাধীনভাবে ময়নাতদন্ত করা না যায়। এইচআরসিপি জানিয়েছে, তারা পাঞ্জাব পুলিশের কাছ থেকে তথ্য চাইলেও সহযোগিতা পায়নি।
একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিচারব্যবস্থার ধীরগতি ও রাজনৈতিক চাপ—এই দুই কারণে এনকাউন্টার বাড়ছে। আদালতের বিলম্ব ও দুর্বল তদন্তে মানুষ ও পুলিশ হতাশ হয়, তখন শর্টকাট হিসেবে বেআইনি হত্যার পথ নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক, পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ
গত এক দশকে সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার এনকাউন্টার হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার পাঞ্জাবেই। ২০২৪ সালে এনকাউন্টার হঠাৎ বেড়ে ১,০০৮-এ পৌঁছায়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসবের অনেকটাই সাজানো এনকাউন্টার। লাহোরের আইনজীবী রিদা হোসেন বলেন, এ ধরনের সহিংসতা ঔপনিবেশিক শাসন ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের পুরোনো সংস্কৃতির অংশ।
তার মতে, সরকার ‘জিরো ক্রাইম’ দেখাতে গিয়ে আরেক ধরনের রাষ্ট্রীয় অপরাধকে স্বাভাবিক করে তুলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আজ যদি অপরাধী সন্দেহে কাউকে হত্যা করা যায়, কাল ভিন্নমতাবলম্বী বা নিরপরাধ মানুষও একইভাবে টার্গেট হতে পারে।
]]>
২ সপ্তাহ আগে
৪






Bengali (BD) ·
English (US) ·