পরমাণু ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা চলছে যুক্তরাষ্ট্রের। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, ইরানকে তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বাতিল করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে হবে। তা না হলে ইরানে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে।
তবে ট্রাম্পের এসব হুমকি খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না ইরান। বরং পাল্টা হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলছেন, মার্কিন হুমকির কাছে ইরান মাথা নত করবে না। ইরানে হামলা হলে তার কঠিন জবাব দেয়া হবে।
এমন হুমকি-পাল্টা হুমকি আর উত্তেজনাময় পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের দোরগোড়ায় যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপি চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়ায় কমপক্ষে চারটি দূরপাল্লার ‘স্টিলথ বি-টু স্পিরিট’ বোমারু বিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
আরও পড়ুন: ‘আগ্রাসনের প্রতিশোধ’ / মার্কিন যুদ্ধজাহাজে একের পর এক হামলা হুতির
ইউরোপীয় দেশগুলো চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কূটনৈতিক উপায় তৈরি করতে চাইছে। মূলত এই সময়সীমার মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ২০১৫ সালের ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
তেহরান অবশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। পশ্চিম এশিয়ার এই দেশটি জোর দিয়ে বলছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
আল জাজিরার প্রতিবেদন মতে, বুধবার প্যারিসে ইরান বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। যার নেতৃত্ব দেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বৈঠকের পর ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তেহরানের সাথে সংকটের কূটনৈকিক সমাধানের সুযোগ কম।
তার ভাষায় ‘সুযোগের জানালা সংকীর্ণ। এই (২০১৫) চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আমাদের হাতে মাত্র কয়েক মাস সময় আছে। ব্যর্থ হলে সামরিক সংঘাত প্রায় অনিবার্য।’ ব্যারো আরও বলেন, ‘আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া হবে না।’
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘বড় অভিযানের’ প্রস্তুতি ইরানের!
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফ্রান্সের অগ্রাধিকার হলো- ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার জন্য একটি ‘যাচাইযোগ্য ও টেকসই’ চুক্তি নিশ্চিত করা।
২০১৫ সালে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার জন্য ইরানের সঙ্গে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে একটি পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ছয় শক্তিধর দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী বাকি দেশগুলো হচ্ছে ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, চীন ও রাশিয়া।
কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘একপেশে’ অভিহিত করে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন। এরপর তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল করা হয়। মূলত ওয়াশিংটন চুক্তি থেকে সরে যাওয়ায় ঐতিহাসিক চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। এরপর ইরানও চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলা বন্ধ করে দেয়।
এরপর গত কয়েক বছরে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে চুক্তির সীমা অতিক্রম করে উচ্চ স্তরের বিশুদ্ধতা মজুদ তৈরি করেছে, যা পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো বেসামরিক জ্বালানি কর্মসূচির জন্য যতটা ন্যায্য বলে মনে করে তার চেয়ে অনেক বেশি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণের কাছাকাছি।
আরও পড়ুন: ইরানের সামরিক কমান্ডারদের দিয়েগো গার্সিয়ায় আগাম হামলা চালানোর আহ্বান
ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরাতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত আলোচনা হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের’ নীতি অনুসরণ করছে।
]]>