নীলফামারীতে ৫৩ লাখ টাকার শোধনাগার, ৫ বছরেও মিলল না এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি

১ সপ্তাহে আগে
নীলফামারী জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ আয়রন ও আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ খাবার পানির নিশ্চয়তা দিতে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৫৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩৩ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক পানি শোধনাগারটি আজ পাঁচ বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত জেলার প্রায় ২০ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭ জন মানুষ। ফলে নিরাপদ পানি পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় সাধারণ মানুষ নানা ধরনের পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়রা জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০২০ সালে এই পানি শোধনাগার প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। উদ্দেশ্য ছিল জেলার বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত পানিতে আয়রন ও আর্সেনিকের মাত্রা পরীক্ষা করে তা পরিশোধনের মাধ্যমে জনগণকে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে শোধনাগারটি চালু না হওয়ায় সেই লক্ষ্য আজও অধরাই থেকে গেছে।


সরেজমিনে দেখা যায়, পানি শোধনাগারের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় শোধনাগারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি যেমন সুইচ, মোটর, ফিল্টার, পাইপলাইন, রিজার্ভ ট্যাংক, পাম্প গ্যালারি, জেনারেটর ও ট্রান্সফরমার ধীরে ধীরে নষ্ট হতে শুরু করেছে। অনেক যন্ত্রপাতির ওপর জমেছে পুরু ধুলার স্তূপ। কিছু যন্ত্র এখনো বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে, যা দেখে বোঝা যায় সেগুলো কখনোই ব্যবহার করা হয়নি। ভবনটির চারপাশে গড়ে উঠেছে ঘন জঙ্গল, যা সাপ ও পোকামাকড়ের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে এত বড় একটি প্রকল্প আজও চালু হয়নি। নীলফামারী জেলার অধিকাংশ নলকূপের পানিতে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন এই পানি পান করলে ত্বকের সমস্যা, পেটের অসুখসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর্সেনিকের ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অথচ এসব সমস্যার সমাধানে নির্মিত শোধনাগারটি বছরের পর বছর অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আয়রন যুক্ত পানি ব্যবহার করছেন।


নীলফামারী সদর উপজেলার এক বাসিন্দা মো. শাহিন শাহ  বলেন, আমরা প্রতিদিন নলকূপের পানি ব্যবহার করি। পানিতে আয়রন বেশি থাকায় কাপড় ধুলেও দাগ পড়ে, রান্নার হাঁড়ি কালচে হয়ে যায়। শুনেছি এখানে একটা পানি শোধনাগার আছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এর কোনো সুবিধা পাইনি। এমন প্রকল্প থাকলেও আমাদের জানানো হয়নি, ব্যবহার তো দূরের কথা।


একই এলাকার বাসিন্দা একরামুল হক বলেন, সরকার কোটি টাকা খরচ করে শোধনাগার বানিয়েছে, অথচ সেটা তালাবদ্ধ পড়ে আছে। আমরা সাধারণ মানুষ অসুস্থ হচ্ছি আর শোধনাগার চালু না করায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত এটি চালু না হলে পুরো প্রকল্পই অকেজো হয়ে যাবে।


আরও পড়ুন: পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের কথা বলে ৫ কোটি টাকার নিষিদ্ধ সিগারেট আমদানি


এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এ. এন. মোহাম্মদ নাঈমুল এহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তার এই অনীহা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে জনগণের করের টাকায় নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বচ্ছভাবে বক্তব্য দেয়া উচিত।


তবে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নাউরুজ্জান এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পানি শোধনাগারটি চালু করার চেষ্টা করবো। জনগণের নিরাপদ পানির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাংগঠনিক সম্পাদক নুর আলম বাবু বলেন, শুধু আশ্বাস দিলেই হবে না। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে সংস্কার করতে হবে, দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো স্থাপনাটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে যা হবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।


জেলাবাসীর দাবি, অবিলম্বে পানি শোধনাগারটি চালু করে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবার পানি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। এতে একদিকে যেমন জেলার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে। অন্যদিকে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। পাঁচ বছর ধরে অচল পড়ে থাকা এই শোধনাগারটি চালু করা এখন সময়ের দাবি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে নীলফামারীর লাখো মানুষ নিরাপদ পানির অধিকার থেকে আরও দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকবে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন