দস্যুতা ঠেকাতে সাগরে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

১৯ ঘন্টা আগে
হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরে বেড়েছে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য। ট্রলার নিয়ে সাগরে ছদ্মবেশে অস্ত্রের মুখে জেলেদের নির্যাতন ও জিম্মি করে ছিনিয়ে নিচ্ছে জাল, মাছ, জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি। আবার জেলেদের গুলি করেও মারছে দস্যুরা। এমন পরিস্থিতিতে নাফ নদী থেকে গভীর সাগরে দস্যুতা ঠেকাতে ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়িয়েছে কোস্টগার্ড।

সম্প্রতি দস্যুদের কবলে পড়েন কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার ‘উম্মে হাবীবা’ নামে একটি মাছধরা ট্রলারের ১২ জেলে। পরে নেটওয়ার্ক এলাকায় পৌঁছালে কোস্টগার্ডের টহল দল তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

 

এফবি উম্মে হাবীবা ট্রলারের মাঝি রশিদ উল্লাহ বলেন, আমরা প্রায় ১০-১২ দিন ধরে সাগরে ছিলাম মাছ ধরার জন্য। ১২ দিনের মাথায় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু যাওয়ার আগে ট্রলারে ডাকাতি হয়। তারা আমাদের মারধর করে এবং মাছ নিয়ে যায়। ঘটনার সময় আমরা সাগরের গভীরে ছিলাম, সেখানে কোনো নেটওয়ার্ক ছিল না। তাই সঙ্গে সঙ্গে কাউকে বিষয়টি জানাতে পারিনি। পরে উপকূলে ফিরে এসে নেটওয়ার্ক পাওয়ার পর বিষয়টি জানানো সম্ভব হয়।

 

আরেক জেলে মোহাম্মদ সজীব বলেন, সাগরে মাছ ধরার সময় তিনদিন আগে হঠাৎ করে এফবি লায়লা ও আসুয়া নামের দুটি ট্রলার জেলেদের ছদ্মবেশে এসে সব মাছ লুট করে নিয়ে গেছে। অস্ত্রের মুখে আমরা ছিলাম নিরুপায়। শুধু দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।

 

শুধু এ ঘটনাই নয়, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে দস্যুদের তৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি দস্যুদের গুলিতে কুতুবদিয়ার জেলে শাহাদাত নিহত হন।

 

জেলেদের দাবি-হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরে বেড়েছে জলদস্যুদের তৎপরতা। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রামের বাঁশখালী, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সোনাদিয়া এলাকায় তাণ্ডব চালাচ্ছে দস্যুরা। নির্যাতন করে ছিনিয়ে নিচ্ছে মাছ, জাল ও জ্বালানি। নষ্ট করে দিচ্ছে ট্রলারের যন্ত্রপাতি।

 

এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি সাব্বির আহমদ বলেন, ‘বাঁশখালী, কুতুবদিয়া ও সোনাদিয়ার দস্যুরা সাগরে ডাকাতি করছে। এমন ঘটনা এখন প্রায় সময় হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে সাগরে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানাই।’

 

আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুর গুলিতে জেলে নিহত

 

এদিকে, দস্যুদের তৎপরতা রুখে দিতে নাফ নদী থেকে শুরু করে গভীর সাগরে টহল জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি করেছে কোস্টগার্ড। যুক্ত করেছে আধুনিক র‌্যাডার, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম, ভিএইচএফ ও এইচএফ কমিউনিকেশন সিস্টেম এবং জিপিএস প্রযুক্তি। যার মাধ্যমে সন্দেহজনক সব ধরনের জলযানের গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে তারা।

 

কোস্টগার্ডের শাহপরী স্টেশন কমান্ডার লে. মো. শাহাদাত হোসেন নাঈম বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সমুদ্র এলাকায় ডাকাত ও জলদস্যুদের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক ও দমনে কোস্টগার্ড দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার করেছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যক্রমও বাড়িয়েছি।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ এবং উচ্চগতির স্পিডবোটের মাধ্যমে নিয়মিত টহল পরিচালনার পাশাপাশি আধুনিক রাডার, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম, ভিএইচএফ ও এইচএফ কমিউনিকেশন সিস্টেম এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোস্টগার্ডের আওতাধীন নাফ নদী ও সমুদ্র সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের জলযান এবং সন্দেহজনক গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

 

শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘গত দুমাসে কোস্টগার্ড পরিচালিত একাধিক বিশেষ অভিযানে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র ও ৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজসহ ৩০ জন ডাকাত এবং জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ডাকাতদের কবলে জিম্মি থাকা ৩২ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে তাদের পরিবারে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

 

আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুর হানা, ট্রলার লুটসহ হতাহত বাংলাদেশি জেলেরা

 

এদিকে শুক্রবার কোস্টগার্ড বেইস চট্টগ্রাম, জাহাজ ‘কুতুবদিয়া’ এবং কক্সবাজার, মহেশখালী, মাতারবাড়ী, কুতুবদিয়া ও শাহপরী স্টেশনের সমন্বয়ে দিনব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জেলেদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য বলছে কোস্টগার্ড।

 

কোস্টগার্ডের শাহপরী স্টেশন কমান্ডার লে: মো. শাহাদাত হোসেন নাঈম বলেন, ‘কোস্টগার্ডের বিভিন্ন জাহাজ সারা বছর সমুদ্রে মোতায়েন থাকে। শুধু একটি নয়, একাধিক জাহাজ বিভিন্ন ধরনের অভিযানে নিয়োজিত রয়েছে-যেমন অপারেশন সুরক্ষা, অপারেশন প্রতিহত, অপারেশন কোরাল দ্বীপসহ অন্যান্য বিশেষ অভিযান। সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য।’

 

তিনি বলেন, ‘জাহাজগুলোতে অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স ও আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম সংযোজিত রয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা খুব দ্রুত যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতা বা হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে সমুদ্রে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এছাড়া বিশেষ হেল্পলাইন সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে। কেউ বিপদে পড়লে বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হলে দ্রুত যোগাযোগ করলে আমরা মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন