আমাদের সমাজে অনেকের ধারণা জাকাত হলো ধনীদের পক্ষ থেকে গরিবদের প্রতি একটি দয়া বা করুণা। কিন্তু ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো এটি ধনীর সম্পদে মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত দরিদ্রের হক বা অলঙ্ঘনীয় পাওনা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে এরশাদ করেছেন,
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ এর অর্থ হলো এবং তাদের অর্থাৎ ধনীদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। সুরা যারিয়াত আয়াত ১৯।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে জাকাত প্রদান করা কোনো করুণা নয় বরং পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া।
ইসলামি শরিয়তে নামাজ যেমন শারীরিক ইবাদত হিসেবে ফরজ জাকাত তেমনি আর্থিক ইবাদত হিসেবে আবশ্যিক করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের নির্দেশ এসেছে যা প্রমাণ করে যে ইসলামের দৃষ্টিতে এই দুটি ইবাদত অবিচ্ছেদ্য। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ এর অর্থ হলো তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু করো। সুরা বাকারা আয়াত ৪৩।
অর্থাৎ একজন মুমিনের নামাজ যেমন আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার শর্ত তেমনি জাকাত প্রদান করাও তার ইমানের পূর্ণতার পরিচায়ক।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিসেও জাকাত আদায়ের গুরুত্ব এবং এর সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত জোরালোভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি ইয়েমেনে মুয়াজ রা. কে পাঠানোর সময় নসিহত করেছিলেন,
أَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ এর অর্থ হলো তুমি তাদের জানিয়ে দাও যে আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে। সহিহ বুখারি।
এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য বিমোচন করা। ইসলাম চায় না যে সম্পদ কেবল ধনীদের হাতেই কুক্ষিগত থাকুক বরং এর সুফল যেন সমাজের একদম সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষটিও ভোগ করতে পারে।
জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার রয়েছে। অনেকে মনে করেন পবিত্র রমজান মাসে নামমাত্র কিছু সস্তা কাপড়ের টুকরো বা শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ করলেই জাকাতের হক আদায় হয়ে যায়। এটি ইসলামের সুমহান শিক্ষার সাথে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়।
আরও পড়ুন: রোজাদারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩ হাদিস
জাকাত দিতে হবে এমনভাবে যেন গ্রহণকারী ব্যক্তি সেই সম্পদ দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং আগামী বছর তাকে আর জাকাত নিতে না হয়। লোক-দেখানো আয়োজন করে কিংবা মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে চরম অপদস্থ করে জাকাত প্রদান করলে মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে যা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
مَنْ لَا يَرْحَمِ النَّاسَ لَا يَرْحَمْهُ اللَّهُ এর অর্থ হলো যে মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না। সহিহ বুখারি। তাই জাকাত দেওয়ার সময় হৃদয়ে বিনয় ও সেবা করার মানসিকতা থাকা আবশ্যক।
যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পরও জাকাত আদায়ে অবহেলা করেন তাদের জন্য পরকালে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ এর অর্থ হলো আর যারা সোনা ও রুপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন। সুরা তওবা আয়াত ৩৪।
সুতরাং জাকাত প্রদান কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয় বরং এটি পরকালীন ভয়াবহ আজাব থেকে মুক্তির একটি বড় উপায়। পবিত্র রমজান মাস হলো আত্মসংযম ও সহমর্মিতার মাস। এই মাসে একটি ফরজের সওয়াব অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ সম্পদের সঠিক ও নির্ভুল হিসাব করে বছরান্তে আড়াই শতাংশ জাকাত গরিব আত্মীয় স্বজন ও অভাবী প্রতিবেশীদের মাঝে সুন্দরভাবে বণ্টন করা।
যদি সমাজের সকল সচ্ছল মানুষ সঠিকভাবে জাকাত আদায় করত তবে আমাদের দেশে একজন মানুষও অভুক্ত থাকত না এবং সমাজ থেকে অপরাধ প্রবণতা বহুলাংশে কমে আসত। জাকাত ব্যবস্থা কেবল দারিদ্র্যই দূর করে না বরং মানুষের অন্তরের কৃপণতা ও স্বার্থপরতা দূর করে তাকে পবিত্র করে।
পরিশেষে বলা যায়, জাকাত হলো ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য, যা ধনী ও দরিদ্রের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই রমজান মাসে যথাযথভাবে জাকাত আদায়ের মাধ্যমে আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোর তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করুন। আমিন।
]]>
২ দিন আগে
১








Bengali (BD) ·
English (US) ·