চুয়েটে ব্যবহার ছাড়াই অকেজো হওয়ার পথে কোটি টাকার গবেষণা যন্ত্র

১ সপ্তাহে আগে
২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ‘নেদারল্যান্ডস ইনিশিয়েটিভ ফর ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট ইন হায়ার এডুকেশন’ (NICHE) প্রকল্পের অধীনে আন্তর্জাতিক সংস্থা নেদারল্যান্ডস ইউনিভার্সিটিজ ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (নুফিক) এর অর্থায়নে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি 'মাল্টিপারপাস টিল্টিং ফ্লুম' ক্রয় করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপে স্থাপন করা হয়।

২০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১.৫ মিটার প্রস্থ ও উচ্চতাবিশিষ্ট এই যন্ত্রটির জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত ৩০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ মিটার প্রস্থের একটি কক্ষ। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্কশপের সংকীর্ণ এক কোণে এটি স্থাপন করা হয়েছে। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কাঠের আসবাবসহ বিভিন্ন কাঠামো। এতে যন্ত্রটির কাছে পৌঁছানোর মতো নেই পর্যাপ্ত জায়গা, এমনকি হাঁটার জন্যও নির্মাণ করা হয়নি কোনো বেইজ ।


দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় ধুলো ময়লার আস্তরণ আর মাকড়সার জাল জড়িয়ে ধরেছে কোটি টাকা মূল্যের এই আধুনিক ল্যাব সরঞ্জামটিকে। রক্ষণাবেক্ষণ আর ব্যবহারের অভাবে মূল্যবান এই যন্ত্রটি এখন নষ্ট হওয়ার পথে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যন্ত্রটি চালানোর জন্য ৫০ অশ্বক্ষমতার দুটি পাম্প রয়েছে, যার একটি ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যটি সচল থাকলেও সেটির ফ্লো-মিটার কাজ করছে না। এছাড়া পাশেই উড শপ থাকায় কাঠের গুঁড়ো পড়ে যন্ত্রটির যান্ত্রিক ক্ষতি হচ্ছে।


এই যন্ত্রটি ব্যবহার করেছেন এমন একজন সহকারী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি সর্বশেষ আমি ৩ বছর আগে চালিয়েছি। একটি প্রকল্পের কাজ করতে চেয়েছিলাম যেখানে পলি বা তলানি পরিবহন এর কাজ ছিল। কিন্তু যন্ত্রটিতে কোনো তলানি সংগ্রাহক নেই, ফলে পলি দেওয়া হলে প্রবাহের সাথে সেগুলো পাম্পের মুখে চলে যাবে। এতে পাম্প ব্লক হয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমি আর ঝুঁকি নেইনি। আবার রিজার্ভার ট্যাংকের ক্যাপাসিটি অনেক, এত বিশাল আকৃতির যে সেখানে অনেক বেশি পরিমাণ পানি লাগে। ঘটনা হচ্ছে ট্যাংকের কোথাও একটা লিকেজ আছে। লিকেজ থাকার কারণে রিজার্ভারে আগের দিন পানি দিলে পরের দিন পানির স্তর অনেকটা কমে যায়। ২টি পাম্পের মধ্যে আবার একটি নষ্ট। তবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প হওয়ায় একটা দিয়েও কাজ চালানো যায় কিন্তু সেটির আবার ফ্লো মিটার নষ্ট। এখন এই যন্ত্র ব্যবহার না করলে সমস্যা তো বাড়বেই। এটা সচল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা স্থাপনের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা বাইরে খোলা স্থানে।


আরও পড়ুন: চবিতে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবিতে মানববন্ধন

পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিয়াজ আক্তার মল্লিক বলেন, যে উদ্দেশ্যে এটি নিয়ে আসা হয়েছিল সেটি সফল হয়নি। এটি ব্যবহার করে উচ্চতর গবেষণা হচ্ছে না বা কোনো কাজই এই মুহূর্তে হচ্ছে না। কারণ এই ধরনের গবেষণা করার মতো শিক্ষার্থী ও গবেষক পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সেটি সফল করার জন্য পরবর্তীতে আমরা কাজ করতে পারি। আর উদ্দেশ্য সফল না হলে এটাকে ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করে দিতে হবে। দশ বছর চলে গিয়েছে, এটার মোটর ঠিক আছে কিনা এ বিষয়েও সন্দেহ আছে। তবে মূল কাঠামো ঠিক আছে। কেউ যদি কোনো উদ্যোগ নেয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় সমর্থন দিলে তা করা যাবে।


বিশাল এই যন্ত্রটি ওয়ার্কশপ এর অনেকটা জায়গা দখল করে থাকায় শিক্ষার্থীদের ল্যাব ক্লাস ও চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। 


এ বিষয়ে ওয়ার্কশপের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আহসানউল্লাহ বলেন, আসলে এই যন্ত্রটি এখানে স্থাপনের ফলে আমাদের ফাউন্ড্রি অ্যান্ড ওয়েল্ডিং শপ যে সেকশনে আছে সেই জায়গাটি অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের বসার স্থান এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অসুবিধা হচ্ছে। এই যন্ত্রটি ব্যবহারও হচ্ছে না এবং এটি এক হিসেবে ওয়ার্কশপের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি এটি সরানো সম্ভব হয় তবে আমাদের জন্য, শিক্ষার্থীদের জন্য এবং ওয়ার্কশপের জন্য ভালো হয়।


আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চুয়েট উপাচার্যের অভিনন্দন


উল্লেখ্য, ফ্লুম মূলত পানি বা তরল পদার্থের প্রবাহ পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত একটি কৃত্রিম নালা বা কাঠামো। চুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের ইরিগেশন ল্যাবে  একটি ছোট ফ্লুম রয়েছে, যা দিয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ল্যাব পরীক্ষাসমূহ করানো হয়। তবে ছোট ফ্লুম দিয়ে স্নাতক পর্যায়ের এসব পরীক্ষা চালানো সম্ভব হলেও, বৃহৎ পরিসরে কোনো বাস্তবধর্মী প্রতিরূপ তৈরি, পলি পরিবহন, প্রবাহ কাঠামোর বিশ্লেষণসহ উচ্চতর গবেষণার জন্য প্রয়োজন বৃহদাকৃতির এই ফ্লুমটির। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর ব্যবহারের অভাবে বর্তমানে উচ্চতর গবেষণার এই আধুনিক যন্ত্রটি পরিণত হচ্ছে ভাঙ্গারিতে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন