কক্সবাজার জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস জানান, সোমবার (১২ জানুয়ারি) পর্যন্ত এই ৫৭ জন টেকনাফ থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
তিনি বলেন, রোববার ৫৩ জন এবং সোমবার সকালে আরও চারজন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে একজন আহত রয়েছেন এবং তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মামলা দায়ের হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থল মাইনে পা হারানো যুবক
সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়েছেন এক যুবক। সোমবার সকাল ১০টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে মাইন বিস্ফোরণে আবু হানিফ (২২) নামের এক মৎস্যজীবীর বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্তের নাফ নদীর শাহজাহানের দ্বীপ ও হাঁসের দ্বীপের মাঝামাঝি এলাকায়। আবু হানিফ ওই এলাকার ফজল করিমের ছেলে।
আরও পড়ুন: মিয়ানমারে সংঘাত / হুমকিতে সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা
আহতের বাবা ফজল করিম জানান, সকালে আমার ছেলে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে জেগে ওঠা শাহজাহানের দ্বীপে জাল ও নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যায়। এক পর্যায়ে নদীতে নামার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ছেলের বাম পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অন্য পায়েও আঘাত লাগে। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থল মাইনের বিস্ফোরণেই এ ঘটনা ঘটেছে।
পরে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ শিশু সংকটাপন্ন
অন্যদিকে, হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত বাংলাদেশি এক শিশুর অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। সে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন জানান, শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
সোমবার দুপুর ২টার দিকে তিনি বলেন, রোববার রাতে শিশুটির অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবে তার মাথায় বিদ্ধ গুলিটি বের করা সম্ভব হয়নি। গুলিটি এমন জায়গায় রয়েছে, সেটি বের করতে গেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শিশুটির জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমানে তাকে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। তবে গতকাল থেকে আজ তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় আফনান আরা (১২) নামের ওই শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়। একই ঘটনায় আরও একজন আহত হন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
সীমান্তবাসীর মানববন্ধন
এদিকে সীমান্ত এলাকায় একের পর এক ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে টেকনাফে মানববন্ধন করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। সোমবার বেলা ১১টার দিকে হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ হাইওয়ে সড়কে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে এসব হামলা বন্ধের দাবি জানান।
মানববন্ধনে মো. আলম নামে এক বক্তা বলেন, একজন নিরীহ শিশু শিক্ষার্থীর ওপর সীমান্তের ওপার থেকে গুলি এসে লাগা চরম মানবতাবিরোধী কাজ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
আরেক বক্তা আলী হোসেন বলেন, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমান্তে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
মানববন্ধনে আরও দাবি জানানো হয়, আহত শিক্ষার্থী হুজাইফা সুলতানা আফরানের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো নিরীহ মানুষ এ ধরনের হামলার শিকার না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।
বক্তারা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত যেন বাংলাদেশে এসে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে না পারে, সেজন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নতুন সংকট, কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
ঘটনার বিষয়ে আহত শিক্ষার্থীর বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, গত রোববার তার মেয়ে খেলতে বের হওয়ার সময় মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ছোড়া গুলি এসে মাথায় লাগে। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি রয়েছে। তিনি তার মেয়ের সুচিকিৎসা এবং সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
এ বিষয়ে সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।
সীমান্তবাসীর দাবি, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির আস্তানা ঘিরে দেশটির সেনাবাহিনী বিমান ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে স্থলভাগে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাতে জড়াচ্ছে। এসব সংঘাতের প্রভাবই এখন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে পড়ছে।
]]>
৩ দিন আগে
৩








Bengali (BD) ·
English (US) ·