গণঅভ্যুত্থানের পর ১৫ মাসে কারা হেফাজতে ১১২ জনের মৃত্যু

৪ সপ্তাহ আগে
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আগে প্রতি বছর যে পরিমাণ মানুষ কারা হেফাজতে মারা যেতেন, সেই সংখ্যা অভ্যুত্থানের পরও প্রায় একইরকম। নিহতদের পরিবার অভিযোগ করছেন, চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাদের স্বজন মারা গেছেন। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কারা অধিদফতরের দাবি, হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো অবহেলার সুযোগ নেই। এদিকে হেফাজতে মৃত্যু মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ ২৯ নভেম্বর রাতে কারা হেফাজতে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সোনালি ব্যাংকের সাড়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন তানভীর। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় অসুস্থতা বেড়ে গেলে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সেদিন বিকেলে ঢামেক হাসপাতাল নেয়ার পর মারা যান তিনি।

 

পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই মারা গেছেন তানভীর। তার ভাই শামীম আল মামুন বলেন, ইচ্ছে করেই দেয়া হয়নি চিকিৎসা। অসুস্থদের ফেলে রেখে দেয়া হয়েছে কারাগারে। কোনো খাবার নেই, কিছু নেই। হাই সিকিউরিটিতে আরও অত্যাচার করে মারা হচ্ছে।

 

আরও পড়ুন: ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসামির মৃত্যু

 

ঢাকা উত্তরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা লীগের সভাপতি মনোয়ারা মজলিশ গত ২৬ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগে কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

 

পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে দুইদিন রেখে ঠিকমতো চিকিৎসা না দিয়ে তাদের জানানো হয়। মৃত মনোয়ারার স্বামী মজলিস মিয়া বলেন, কিডনির সমস্যা থাকলেও হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ১৫ মাসে ১১২ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন। চলতি বছরের ১১ মাসেই যে সংখ্যা ৯৫ জন। যেখানে ২০২৪ সালের ১২ মাসে ছিল ৬৫ জন। গত ৫ বছরের হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪১২।

 

কারা হেফাজতে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন বেশিরভাগই মারা যায় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। গত সেপ্টেম্বরে সাবেক শিল্পমন্ত্রীর মৃত্যুর আগে হাতকড়া পরিহিত ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। অসুস্থ বন্দির মানবাধিকার নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। ঢামেক কর্তৃপক্ষের দাবি, কারাগার থেকে আসা বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগ নেই। ডিভিশনপ্রাপ্ত না হয়েও অনেকে ডিভিশনের সুযোগ-সুবিধার দাবি করে। সেটা না পেলেই অভিযোগ করে।

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ডিভিশন প্রাপ্ত আসামি যে সুবিধা পায় অনেকেই সেই সুবিধাটা ক্লেইম করে; তখন তো সেটা আমরা তাকে দিতে পারি না। হাসপাতালে থাকার দরকার নেই; কিন্তু সে থাকতে চায়। তার এটেন্ডেন্টরাও তাকে রাখতে চায়। যখন আমরা রাখি না, তখন তারা এটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করে।’

 

আরও পড়ুন: গাজীপুর কারাগারে ‘আয়নাবাজি’ সংবাদের পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা

 

তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারে চিকিৎসায় ৪১ জন আবাসিক ডাক্তারের মধ্যে মাত্র ২ জন দায়িত্বে আছেন এবং পর্যাপ্ত আইসিইউও নেই। এই কারণে অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা দিতে কিছু ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগলেও অবহেলার সুযোগ নেই।

 

কারা মহাপরিদর্শক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, ‘ইমারজেন্সি ক্রিয়েট হলে আমরা সরাসরি হাসপাতালের ডাক্তার পাই না। তাই নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। এতে কিছু সমস্যা হয় বা মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য সেবা অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বয় করছি। কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে দায়ীদের শাস্তি দেয়া হয়।’

 

মানবাধিকার সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ বলেছে, ‘২৪ সালের অভ্যুত্থানের আগেও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক ছিল এবং অভ্যুত্থানের পরও পরিস্থিতি বদলায়নি। নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, ‘অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট পুরোপুরি ভায়োলেট করা হচ্ছে। গত সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির কারণে আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম, কিন্তু নতুন সরকার আসার পরও পরিবর্তনের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না।’

 

পাশাপাশি বন্দিদের মানবাধিকার নিশ্চিতে কারাগারে মানবাধিকার সংগঠনদের নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে হবে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন