খুলনায় অযত্নে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সংরক্ষণে উদ্যোগ নেই

৪ সপ্তাহ আগে
খুলনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো বছরের পর বছর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

একাত্তরের গণহত্যা ও বর্বরতার নীরব সাক্ষী গল্লামারী স্মৃতি সৌধ এবং চুকনগর বধ্যভূমি আংশিকভাবে সংরক্ষিত হলেও বাস্তবে সেগুলো এখনো অরক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও এমন চিত্রে হতাশা প্রকাশ করছেন মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও সচেতন নাগরিকরা।

 

খুলনার গল্লামারী এলাকা দেশের অন্যতম গণহত্যাস্থল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন, বছরের অধিকাংশ সময়ই সেখানে দেখা যায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আবর্জনার স্তূপ, এমনকি মাদকসেবীদের আনাগোনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা না থাকায় এই ঐতিহাসিক স্থান তার মর্যাদা হারাচ্ছে।


১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে খুলনা অঞ্চল ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। গল্লামারীতে হত্যা করা হয় অসংখ্য বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে। অন্যদিকে, ২০ মে সংঘটিত চুকনগর গণহত্যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যা একদিনে সংঘটিত বৃহত্তম গণহত্যাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত ।

আরও পড়ুন: ঈদ আনন্দ নেই খুলনার পাটকল শ্রমিকদের

ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতগামী শরণার্থীদের ওপর পরিকল্পিত এই হামলায় ভদ্রা নদীর পানি পর্যন্ত রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। অথচ এত বড় ট্র্যাজেডির স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে এখনো পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। চুকনগরে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ দীর্ঘদিন ধরে অপূর্ণ ও অযত্নে পড়ে আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে ।
স্বাধীনতার পর এসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও তা এখন মূলত দিবসভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এসব এলাকা অরক্ষিত থাকে। 


চুকনগর গণহত্যা একাত্তর স্মৃতি পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম জানান, নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হলে এসব স্থানকে সংরক্ষণ ও পরিচর্যার আওতায় আনতেই হবে। তিনি বলেন, এসব স্থান সংরক্ষণের জন্য আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি, সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি।


খুলনার রনাঙ্গনের যোদ্ধা এবিএম নুরুল আলম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিলো খুলনা। খুলনার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা  হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে বহু মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তাদের স্মরণে কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি।


গল্লামারী ও চুকনগরকে ঘিরে সীমানা প্রাচীর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র ও লাইব্রেরিসহ পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন হয়নি। খুলনা মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মনিরুজ্জামান মনি দ্রুত এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।


জেলা প্রশাসক আ ম স জামসেদ খোন্দকার জানান, নতুন পরিকল্পনার আওতায় খুলনার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো উন্নয়ন ও সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। 


তিনি বলেন, ‘খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে তাদের বিভিন্ন দাবির কথা জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত স্থানগুলো সংরক্ষণ জরুরি। প্রস্তাবনাগুলো আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি দ্রতই নতুন পরিকল্পনায় এসব স্থানের উন্নয়ন করা হবে।’

আরও পড়ুন: ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী খুলনার ‘মসজিদকুড়’ মসজিদ

শুধু গল্লামারী বা চুকনগর নয়, শিরোমনী যুদ্ধক্ষেত্র, নিউজপ্রিন্ট মিলের ভেতরে শহীদদের কবর, ভুতের বাড়ি এলাকার প্রথম রাজাকার ক্যাম্প, নয়াবাটির মুন্সিবাড়ী এবং রূপসায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর মহিবুল্লাহর সমাধিসহ অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন আজও অরক্ষিত রয়েছে।


মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মৃতিবিজড়িত স্থান কেবল স্থাপনা নয়, বরং জাতির বীরত্বগাঁথা ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে এখনই সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি—অন্যথায় ইতিহাস বিকৃত বা বিস্মৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন