দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন শিশুশিল্পী খুব বেশি নেই, যিনি মাত্র চার বছর বয়সেই দর্শকের হৃদয় জয় করে জাতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। সেই অভিনেত্রী শ্যামলী একসময় যিনি দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুশিল্পীদের একজন ছিলেন, আজ তিনি আলোচনার বাইরে, অন্য এক শিল্পজগতে নিজের নতুন পরিচয় খুঁজে নিয়েছেন।
‘অঞ্জলি’ যে চরিত্র বদলে দিয়েছিল, সবকিছু
১৯৯০ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘অঞ্জলি’ সিনেমা। নির্মাতা মণিরত্নমের এই ছবিতে মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এক শিশুর ভূমিকায় অভিনয় করে মাত্র চার বছর বয়সেই আলোচনায় চলে আসেন শ্যামলী। তার সরল অভিব্যক্তি, নিষ্পাপ চোখ আর হৃদয়স্পর্শী অভিনয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছিল। ফলাফল—জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা শিশুশিল্পীর স্বীকৃতি। এত অল্প বয়সে এমন অর্জন ভারতীয় সিনেমায় বিরল।
চার ইন্ডাস্ট্রির দাপট
‘অঞ্জলি’ই শ্যামলীর একমাত্র সাফল্য ছিল না। শ্যামলী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তামিল, তেলেগু, মালয়ালম ও কন্নড়—দক্ষিণ ভারতের চারটি বড় ইন্ডাস্ট্রিতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তিনি অভিনয় করেছেন চিরঞ্জীবের সঙ্গে, আবার মালয়ালম সিনেমার দুই কিংবদন্তি মামুত্তি ও মোহনলালের সঙ্গেও পর্দা ভাগ করেছেন।
শিশুশিল্পী হিসেবেই নয়, চরিত্রে গভীরতা আনার ক্ষমতার জন্য নির্মাতারা তাকে আলাদা গুরুত্ব দিতেন। কন্নড় সিনেমায় কাজ করে রাজ্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে শ্যামলী ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দের শিশুশিল্পী।
শ্যামলী এখন। ইনস্টাগ্রাম থেকে শিশুশিল্পী থেকে নায়িকা—কঠিন রূপান্তর
অনেক শিশুশিল্পী বড় হয়ে একই সাফল্য ধরে রাখতে পারেন না। শ্যামলীর ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই সামনে আসে। ২০০৯ সালে তেলেগু ছবি ‘ওয়ে!’–এর মাধ্যমে তিনি নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অভিনয়ের জন্য প্রশংসা পেলেও ছবির বক্স অফিস সাফল্য সীমিত ছিল। এরপর থেকেই ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
একসময় তিনি অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১০ থেকে ২০১৫—এই দীর্ঘ সময় সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনে মন দেন।
প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা ২০১৬ সালে তামিল ছবি ‘বীরা শিবাজি’ দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করেন শ্যামলী। একই বছরে একটি মালয়ালম ছবিতেও অভিনয় করেন; কিন্তু দুটিই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এখানেই যেন স্পষ্ট হয়ে যায়—শৈশবের সাফল্যের আলো ধরে বড় পর্দায় নতুন করে দাঁড়ানো সহজ নয়।
শ্যামলী এখন। ইনস্টাগ্রাম থেকে নতুন পরিচয়: অভিনেত্রী থেকে শিল্পী
২০১৮ সালের পর শ্যামলী একেবারে ভিন্ন পথ বেছে নেন। ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন ও ফিল্ম স্টাডিজে পড়াশোনা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি প্যারিস, সিঙ্গাপুর ও ইতালিতে বিভিন্ন আর্ট ফর্মের প্রশিক্ষণ নেন—চায়নিজ ইঙ্ক পেইন্টিং থেকে শুরু করে গ্লাস পেইন্টিং পর্যন্ত। এখন তিনি নিয়মিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে অংশ নেন। চেন্নাই ও দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক আর্ট শোতেও তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। নিজের পরিচয় তিনি দেন খুব সহজভাবে, ‘আমি একজন অভিনেত্রী ও শিল্পী।’
৩০ বছর পর হঠাৎ ভাইরাল সেই অভিনেত্রীআলো থেকে দূরে, কিন্তু ভক্তদের মনে
আজ শ্যামলী খুব কমই জনসমক্ষে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উপস্থিতি সীমিত। তবু ‘অঞ্জলি’র ছোট্ট মেয়েটিকে এখনো ভুলে যাননি দর্শকেরা। পুরোনো ছবির আলোচনা উঠলেই ফিরে আসে সেই নিষ্পাপ মুখ।
একসময় যিনি সিনেমার আলোয় ছিলেন, আজ তিনি রং ও ক্যানভাসে নিজের নতুন পৃথিবী গড়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে








Bengali (BD) ·
English (US) ·